কালজয়ী লেখক আহমদ ছফা সম্পর্কে যেসব জানা জরুরী আপনার

বাঙালী জাতিসত্তা ও মুসলমান জনগোষ্ঠীর সমন্বয় সাধন করার কাজটি খুব বেশি মানুষ করে যেতে পারেননি। জাতিসত্তা ও ধর্মীয় প্রশ্নে রয়েছে নানা ধরণের বিতর্ক, চিন্তার সংঘাত। এসব সংঘাতকেও পাশ কাটিয়ে ধর্ম ও জাতিসত্তার একটি আকৃতি দেয়ার চেষ্টা ছিলো যার- তিনি আহমদ ছফা। বাঙালী, বাংলার মুসলিম মননের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা ছিলো তার মাঝে। বাংলা সাহিত্যের ময়দানে সময়ের পরিক্রমায় শত শত লেখকের আবির্ভাব ঘটেছে সত্য, কিন্তু আহমদ ছফা তার নিজ জায়গাতে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। নিজের লেখালেখির সময়কালে তো বটেই, এমনকি মৃত্যুর পরেও বাঙালী মানুষের নিকট তার আবেদন ফুরায়নি।

আহমদ ছফা এমন একজন লেখক যার গুরুত্ব আজ অবধি সমাজে অনুভব করা যায়, শূন্যতা বোঝা যায় তার মতো একজন লেখক না থাকার। এজন্যই বুঝি জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক ও সলিমুল্লাহ খানসহ আরো অনেকেই বলেছেন- মীর মশাররফ হোসেন ও কাজী নজরুল ইসলামের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি মুসলমান লেখক হলেন আহমদ ছফা। কেননা, তার লেখায় বাংলাদেশি জাতিসত্তার পরিচয় নির্ধারণ প্রাধান্য পেয়েছে। এমন একজন লেখক পাওয়াটাও একটি জাতির জন্য সৌভাগ্যের বিষয়।

আহমদ ছফার ব্যক্তিত্বে সবসময়ই অন্যায়ের সাথে আপোষহীনতা মিশে ছিলো। বলা চলে, তিনি ছিলেন একজন প্রতিবাদী লেখক। তার প্রতিবাদ সম্পর্কে বহু কথাই প্রচলিত রয়েছে। কাউকে তোয়াক্কা করে চলার মতো ব্যক্তিত্ব ছিলেন না তিনি। সকলের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নিজের মতো করেই সব তুলে ধরতেন এই মানুষটি। চলুন তবে আজকে জানা যাক এই মহান লেখকের জীবনের নানা দিক।

জন্ম

আহমদ ছফা জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ শে জুন চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া গ্রামে। তাঁর পিতার নাম হেদায়েত আলী এবং মাতার নাম আসিয়া খাতুন। দুই ভাই ও চার বোনের মধ্যে আহমদ ছফা ছিলেন বাবা-মার দ্বিতীয় সন্তান।

শিক্ষাজীবন

আহমদ ছফার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় তার পিতার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ গাছবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে নিজের গ্রামের নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন তিনি।

১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম নাজিরহাট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন; একই বৎসরে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে।

১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন

১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে এমএ পরীক্ষা দেয়ার আগেই বাংলা একাডেমির পিএইচডি গবেষণা বৃত্তির জন্য আবেদন করেন এবং তিন বছরের ফেলোশিপ প্রোগ্রামের জন্য মনোনীত হন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব, বিকাশ, এবং বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে তার প্রভাব’। শেষ পর্যন্ত পিএইচডি সম্পন্ন করতে পারেননি তিনি।

পরে ১৯৮৬-তে জার্মান ভাষার ওপর গ্যেটে ইন্সটিটিউটের ডিপ্লোমা ডিগ্রিও লাভ করেন তিনি, যা তাকে পরবর্তী সময়ে গ্যেটের অমর সাহিত্যকর্ম ফাউস্ট অনুবাদে সহায়তা করেছিলো।

রাজনৈতিক জীবন

ছাত্রাবস্থায় সুধাংশু বিমল দত্তের মাধ্যমে কৃষক সমিতি-ন্যাপ বা তৎকালীন গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত হন। মাস্টারদা সূর্যসেনের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অণুপ্রাণিত হয়ে তাঁরা কয়েকজন বন্ধু মিলে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন উপড়ে ফেলেন। পরে গ্রেপ্তার এড়াতে কিছুকাল পার্বত্য চট্টগ্রামে আত্মগোপন করেন।

আহমদ ছফা পরবর্তী সময়ে পরিপূর্ণ বামপন্থার ওপর নির্ভর করে পথ চলেননি। বরং বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতির ব্যর্থতার নানা বিষয় নিজের লেখায় তুলে ধরেছিলেন। তার ছিলো স্বকীয় দর্শন। নিজস্ব চিন্তা সৃষ্টি করে সেভাবে চলার পক্ষেই ছিলেন তিনি। এ ব্যাপারে তিনি বলেছিলেন-

‘যে জাতি উন্নত বিজ্ঞান, দর্শন এবং সংস্কৃতির স্রষ্টা হতে পারে না, অথবা সেগুলোকে উপযুক্ত মূল্য দিয়ে গ্রহণ করতে পারে না, তাকে দিয়ে উন্নত রাষ্ট্র্র সৃষ্টিও সম্ভব নয়। যে নিজের বিষয় নিজে চিন্তা করতে জানে না, নিজের ভালোমন্দ নিরূপণ করতে অক্ষম, অপরের পরামর্শ এবং শোনা কথায় যার সমস্ত কাজ-কারবার চলে, তাকে খোলা থেকে আগুনে কিংবা আগুন থেকে খোলায়, এইভাবে পর্যায়ক্রমে লাফ দিতেই হয়।’

ব্যক্তিগত জীবন

আহমদ ছফা সারাজীবন অকৃতদার ছিলেন। তবে কয়েকজন নারীর সাথে তার প্রণয়সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলেন শামীম শিকদার ও সুরাইয়া খানম। এদের সাথে সম্পর্কের ভিত্তিতে ছফা অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী (১৯৯৬) আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস রচনা করেছিলেন।

পেশাগত জীবন ও সাহিত্যকর্ম

আহমদ ছফা নিজের কৃতিত্বের গুণে অসংখ্য কালজয়ী লেখা লিখে গিয়েছেন। তিনি ছিলেন একজন পুরোদস্তুর লেখক। প্রথমেই তার উল্লেখযোগ্য কিছু সাহিত্যকর্মের পাশাপাশি ক্যাটাগরিভেদে সাহিত্যকর্ম তুলে ধরা হলো-

উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম

বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস (১৯৭২)
বাঙালি মুসলমানের মন (১৯৮১)
ওঙ্কার (১৯৭৫)
একজন আলী কেনানের উত্থান-পতন (১৯৮৮)
অলাতচক্র (১৯৯৩)
গাভী বিত্তান্ত (১৯৯৫)
অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী (১৯৯৬)
পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ (১৯৯৬)
যদ্যপি আমার গুরু (১৯৯৮)
ফাউস্ট (১৯৮৬)

প্রবন্ধ

জাগ্রত বাংলাদেশ (১৯৭১)
বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস (১৯৭২)
বাংলা ভাষা: রাজনীতির আলোকে (১৯৭৫)
বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা (১৯৭৭)
বাঙালি মুসলমানের মন (১৯৮১)
শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য প্রবন্ধ (১৯৮৯)
রাজনীতির লেখা (১৯৯৩)
আনুপূর্বিক তসলিমা ও অন্যান্য স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ (১৯৯৪)
নিকট ও দূরের প্রসঙ্গ (১৯৯৫)
সঙ্কটের নানা চেহারা (১৯৯৬)
সাম্প্রতিক বিবেচনা: বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস (১৯৯৭)
শতবর্ষের ফেরারী: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৯৯৭)
শান্তিচুক্তি ও নির্বাচিত প্রবন্ধ (১৯৯৮)
বাঙালি জাতি এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র (২০০১)
উপলক্ষের লেখা (২০০১)
আমার কথা ও অন্যান্য প্রবন্ধ (২০০২)
সেইসব লেখা (২০০৮)
সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস (১৯৭৯)

উপন্যাস

সূর্য তুমি সাথী (১৯৬৭)
ওঙ্কার (১৯৭৫)
একজন আলী কেনানের উত্থান-পতন (১৯৮৮)
মরণবিলাস (১৯৮৯)
অলাতচক্র (১৯৯৩)
গাভী বিত্তান্ত (১৯৯৫)
অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী (আত্মজৈবনিক প্রেমের উপন্যাস,১৯৯৬)
পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ (১৯৯৬

অনুুবাদ

তানিয়া (মূল: পি. লিডভ) (১৯৬৭)
সংশয়ী রচনা: বার্টাণ্ড রাসেল (১৯৮২)
ফাউস্ট (মূল: ইয়োহান ভোলফ্‌ গাঙ ফন গ্যোতে) (১৯৮৬)

কবিতা সম্পাদনা

জল্লাদ সময় (১৯৭৫)
দুঃখের দিনের দোহা (১৯৭৫)
একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা (১৯৭৭)
লেনিন ঘুমোবে এবার (১৯৯৯)
আহিতাগ্নি(২০০১)

গল্পসংগ্রহ
নিহত নক্ষত্র (১৯৬৯)

কিশোর গল্প
দোলো আমার কনকচাঁপা (১৯৬৮)

শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ
গো-হাকিম (১৯৭৭)

পুরস্কার

তিনি লেখক শিবির পুরস্কার ও বাংলা একাডেমি কর্তৃক সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন। [৪৭][৬৫] ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে ইতিহাস পরিষদ পুরস্কার গ্রহণ করেছেন বলে জানা যায়। তাকে ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে সাহিত্যে (মরণোত্তর) একুশে পদক প্রদান করা হয় ।

আহমদ ছফা প্রসঙ্গে যত ক্ষুরধার মন্তব্য

আহমদ ছফা স্বীয় কর্মের গুণে ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বেশ ভালো সংখ্যক মানুষই আহমদ চফার দর্শনের চর্চা করে থাকে। সাধারণ মানুষ হতে শুরু করে খ্যাতিমান সাহিত্যিকরাও আহমদ ছফার সাহিত্যকর্মের প্রশংসা করেছেন।

বাংলা ভাষার একজন শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিক ও ঔপন্যাসিক বলে বিবেচিত[১] আহমদ ছফা ছিলেন ‘সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী কণ্ঠ এবং আদর্শনিষ্ঠ ও প্রগতিপন্থি একজন সংস্কৃতিকর্মী।'[৬৮] ‘ছফার লেখালেখিতে, তার বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় বর্তমানময়তা আছে, আছে ইতিহাসের পরিচ্ছন্নতা। তৃতীয় উপাদান গণমানুষের প্রতি অঙ্গীকার, এবং তা রাজনৈতিক অর্থে। ছফার আরও ছিল সাহস। তার ক্ষেত্রে এ সাহস এসেছে ইতিহাসবোধ থেকে, অঙ্গীকার থেকে।'[৬৯] জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের মতে- ছফার রচনাবলি গুপ্তধনের খনি[৭০] এবং তার সাহিত্যকর্ম স্বকীয় এক জগতের সৃষ্টি করে যে জগতে যেকোন পাঠক হারিয়ে যেতে পারে।[৭১] হুমায়ূন আহমদ আহমদ ছফাকে ‘অসম্ভব শক্তিধর একজন লেখক’ বলে অভিহিত করেছেন[৭২] এবং তাকে নিজের মেন্টর বলে উল্লেখ করেছেন।[২২] মুহম্মদ জাফর ইকবালের মতে, আহমদ ছফা ‘চুলের ডগা থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত’ ‘একশ ভাগ খাঁটি সাহিত্যিক।'[২৫] ইকবাল আরো লিখেছেন, ‘আমাদের বড় সৌভাগ্য তার মতো একজন প্রতিভাবান মানুষের জন্ম হয়েছিল।'[৭৩] আহমদ ছফা সম্পর্কে ফরহাদ মজহার বলেছেন ‘সে [ছফা] গাছবাড়িয়া গ্রাম থেকে আসা অতি সাধারণ একটি গ্রামের ছেলে। কিন্তু সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিন্তা ও রাজনীতির জগতে সে যে উথালপাথাল ধাক্কা দিয়ে গেল তার ফলে বাংলাদেশের সাহিত্য বলি, সংস্কৃতি বলি, রাজনীতি বলি, বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড বলি তার সঙ্গে খোদ একটা বোঝাপড়া না করে কোনো ক্ষেত্রেই অগ্রসর হওয়া যাবে না।'[২৯][৭৪] আহমদ শরীফ বলেছিলেন “সুবিধাবাদীর ‘Life is a compromise’ তত্ত্বে ছফার আস্থা নেই। আজকের বাংলাদেশে এমনি স্পষ্ট ও অপ্রিয়ভাষী আরো কয়েকজন ছফা যদি আমরা পেতাম, তাহলে শ্রেয়তর পথ স্পষ্ট হয়ে উঠত।”[৭৫] সলিমুল্লাহ খান তাকে একজন দ্রষ্টা[৭৬], রাষ্ট্রচিন্তাবিদ[৭৭], বিশ্বের সেরা কাহিনী-কথকদের একজন[৫৫] ও বাংলা ভাষার মহান কথাসাহিত্যিক[২০] বলেছেন। খান মনে করেন ছফা কাজী নজরুল ইসলামের উত্তরাধিকারী।[৭৮] সরদার ফজলুল করিম বলেছিলেন, ছফা কেবল পাঠ করার বিষয় নয়, চর্চা করার বিষয়।[৫৯] “আহমদ ছফা : প্রথার বাইরের মানুষ” নামের এক নিবন্ধে রাশেদ খান মেনন লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের সাহিত্য, বাংলাদেশের মননজগৎ ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডল [ছফাকে] হারিয়ে অনেকখানি রিক্ত হয়ে পড়েছে।'[৭৯][৮০][৮১] রশীদ করীম লিখেছেন, আহমদ ছফার এক একটি শব্দ শিলাখণ্ডের মতন কঠিন, আপাত-উদাসীন নির্মম অথচ তারই অন্তরে গভীর বেদনা ভালোবাসা কী পরিমাণ তার কোন সীমা নেই।[৮২] ছফার উপন্যাস নিয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস লিখেছেন ‘ব্যক্তির মধ্যে ইতিহাসকে ও ইতিহাসে বর্তমান ব্যক্তিটিকে নিবিড় করে অনুভব করার তাগিদে পাঠক আহমদ ছফার অনুসন্ধানী অভিযানে শরিক হবেন।'[৫৬]

ঢাকায় ‘আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা'[৮৩][৮৪] ও চট্টগ্রামে ‘আহমদ ছফা কেন্দ্র’ সভা, সেমিনারের মাধ্যমে আহমদ ছফার জীবন ও কর্মকে উদ্‌যাপন করে। ছফার অনেক গল্প, উপন্যাস মঞ্চনাটক, টেলিভিশন নাটক ও পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে।[৬২][৮৫][৮৬] গাজী তানজিয়া প্রণীত কালের নায়ক (২০১৪) আহমদ ছফার জীবনভিত্তিক একটি উপন্যাস।[৮৭][৮৮]।

আহমদ ছফার কতিপয় উক্তি

* কাউকে জ্ঞান বিতরণের আগে জেনে নিও যে তার মধ্যে সেই জ্ঞানের পিপাসা আছে কি-না। অন্যথায় এ ধরণের জ্ঞান বিতরণ করা হবে এক ধরণের জবরদস্তি। জন্তুর সাথে জবরদস্তি করা যায়, মানুষের সাথে নয়। হিউম্যান উইল রিভল্ট।

* বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কারো রচনায় আমার মন বসে না।

* লোকে যাই বলুক, যাই অনুভব করুক, নিজের কাছে আমি অনন্য।

* যারা মৌলবাদী তারা শতকরা একশো ভাগ মৌলবাদী।কিন্তু যারা প্রগতিশীল বলে দাবী করে থকেন তাদের কেউ কেউ দশ ভাগ প্রগতিশীল, পঞ্চাশ ভাগ সুবিধাবাদী, পনেরো ভাগ কাপুরুষ, পাঁচ ভাগ একেবারে জড়বুদ্ধিসম্পন্ন।

* বাংলাদেশের আসল বস্তু বলে যদি কিছু থাকে তা হলো এর আমলাতান্ত্রিক কাঠামো। স্থবির, অনড়, লোভী, রিদয়হীন এবং বিদেশী শক্তির ক্রীড়নক হওয়ার জন্যে সর্বক্ষণ প্রস্তুত।

* নারীরা নারীই, সঙ্গের সাথী, দুঃখের বন্ধু এবং আদর্শের অনুসারী নয়।

* কার্লাইল গ্যেটেকে মহাপুরুষ মুহাম্মদের চাইতেও বড়ো মনে করেছেন। আমার ধারণা তিনি ভুল করেছেন। কারণ হযরত মুহাম্মদ (সঃ) জীবনের স্বরুপ উপলব্ধি করে নিজস্ব মহিমায় স্থিত করেছেন। আর গ্যয়টে শুধু জীবনের মহিমা কীর্তন করেছেন। Prophetic genious –এর সাথে Poetic genious-এর এখানেই তফাৎ।

* আগেকার নবী পয়গম্বরেরা মানবজীবনের চরম পরম লক্ষ্য বলতে বুঝতেন পরমসত্তার জ্ঞান। এই কালের মানব জীবনের পরম লক্ষ্য কী? সম্ভবত মানুষের সমস্ত সম্ভাবনা বিকশিত করে তোলাই যদি বলা হয়, আশা করি অন্যায় হবে না।

* সভ্যতা কোন দেশ জাতি বা সম্প্রদায় বিশেষের সম্পত্তি নয়— অথচ প্রতিটি তথাকথিত সুসভ্য জাতির মধ্যেই এই সভ্য অভিমান প্রচন্ডভাবে লক্ষ্য করা যায়।

* বস্তুত একজন বিশ্বাসী মানুষ ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে যে ধরনের নির্মল আনন্দ অনুভব করেন, একজন ধর্মবিশ্বাসহীন মানুষ উন্নত সাহিত্য পাঠেও একই আনন্দ পেয়ে থাকেন।

* প্রতিটি রাষ্ট্র নিজস্ব প্রয়োজনে ইতিহাসকে বিকৃত করে।

* বাঙালি মুসলমানের মন যে এখনও আদিম অবস্থায়, তা বাঙালি হওয়ার জন্যও নয় এবং মুসলমান হওয়ার জন্যও নয়। সুদীর্ঘকালব্যাপী একটি ঐতিহাসিক পদ্ধতির দরুণ তাঁর মনের উপর একটি গাঢ় মায়াজাল বিস্তৃত রয়েছে, সজ্ঞানে তাঁর বাইরে সে আসতে পারে না। তাই এক পা যদি এগিয়ে আসে, তিন পা পিছিয়ে যেতে হয়। মানসিক ভীতিই এই সমাজকে চালিয়ে থাকে।

* বাঙালি মুসলমানসমাজ স্বাধীন চিন্তাকেই সবচেয়ে ভয় করে। তাঁর মনের আদিম সংস্কারগুলো কাটেনি। সে কিছুই গ্রহণ করে না মনের গভীরে। ভাসাভাসাভাবে, অনেককিছুই জানার ভান করে, আসলে তাঁর জানাশোনার পরিধি খুবই সংকুচিত।

* হিন্দু বর্ণাশ্রম প্রথাই এ দেশের সাম্প্রদায়িকতার আদিমতম উৎস। কেউ কেউ অবশ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকেই সাম্প্রদায়িকতার জনয়িতা মনে করেন। তাঁরা ভারতীয় ইতিহাসের অতীতকে শুধু ব্রিটিশ শাসনের দু’শ বছরের মধ্যে সীমিত রাখেন বলেই এই ভুলটা করে থাকেন।

মৃত্যু

২০০১ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ জুলাই অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। “পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে জানাজা শেষে মিরপুরের বুদ্ধিজীবী গোরস্থানের পাশে বিশ হাজার টাকা চাদা তুলে জায়গায় কিনে তাকে দাফন করা হয়।”

 

রেফারেন্স-

১। মুখোশ ডট কম

২। প্রগতিরযাত্রী ডট কম

৩। সাহস ডট কম

৪। উইকিপিডিয়া

৫। বিবিধ বই

শেয়ার করুনঃFacebookTwitter
আলোচনায় যোগ দিন

Instagram

Instagram has returned empty data. Please authorize your Instagram account in the plugin settings .