আত্মমর্যাদাহীনতা যেভাবে আপনাকে পিছিয়ে দেয়!

আত্মমর্যাদা আমাদের জীবনের সকল ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। আত্মমর্যাদা অপরের সাথে আমাদের সম্পর্কের ধরণকে সংজ্ঞায়িত করে। আত্মমর্যাদা আমাদের পেশাগত জীবনের সফলতাকে নিশ্চিত করে। আত্মমর্যাদা নির্ধারণ করে আমাদের অন্তরের সুখ, শান্তি। আমাদের আত্মবিশ্বাসের স্তরও ঠিক করে দেয় আত্মমর্যাদা। এমনকি ভবিষ্যতের জন্য আপনি যেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করে রেখেছেন, সেসব লক্ষ্য পূরণের ক্ষেত্রেও আত্মমর্যাদা ভূমিকা পালন করে থাকে। এসব ছাপিয়েও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আপনাদেরকে জানাতে চাই। আর তা হচ্ছে, আপনি হয়তো জানেন না নানা ধরণের ব্যক্তিগত কিংবা সামাজিক স্তরের ডিজঅর্ডারের পেছনেও দায়ী থাকে নিজেকে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন করতে না পারার ব্যর্থতা। কাজেই, নিজেকে মর্যাদাবান করে তোলা, গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার বিষয়টি আমাদের সবার জীবনের সফলতার জন্যই বেশ কার্যকরী একটা বিষয়।

বছরের পর বছর আমি মানুষকে পর্যবেক্ষণ করেছি। আমি দেখেছি মানুষ কেবল একটি অবলম্বনকে কেন্দ্র করে নিজের কাজে সফলতা পেয়েছে। আর সেই অবলম্বন হচ্ছে আত্মমর্যাদা। অনেকেই আমাকে তাদের সফলতার কথা বলতে গিয়ে এটাই জানিয়েছে। যেসব ব্যক্তিরা নিজেদেরকে আত্মমর্যাদাবান করে তুলতে পারে না, তারা সফলতা অর্জন করতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়। নিজের জীবনে কোনো আশা খুঁজে পায় না তারা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তারা নিজেদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, ব্যবসা, সঙ্গী ও কাজ নির্বাচনে ভুল করে থাকে। এক কথায়, তাদের দ্বারা ভুলের হার বেশিই হয়ে থাকে। আবার তাদের মধ্যে কেউ কেউ যদি সফলতা পেয়েও থাকে, তাহলে সেই সফলতাকে উপভোগ করতে পারে না ঠিকমতো। নানা ধরণের ব্যক্তিগত মনস্তাত্ত্বিক জটিলতায় সুখ শান্তি খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয় না তাদের পক্ষে। সবসময়ই তাদের কাছে মনে হয় তারা মানুষের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, মানুষের মতের ওপর তারা নির্ভরশীল এবং পরিস্থিতি দ্বারা সবসময়ই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ইন ফ্যাক্ট, পরিস্থিতির দোষ তারা সবসময়ই দিয়ে থাকে।

কম আত্মমর্যাদাবান মানুষ কিংবা আত্মমর্যাদাহীন মানুষেরা নিজেদের জীবনকে পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশ জটিলতা দেখতে পায়। তারা মানুষের সমালোচনা নিতে পারে না। সমালোচনাকে ডিফেন্ড করতে পারে না সহজে। এমন নানা কারণে আত্মমর্যাদাহীনতা আপনাকে বানিয়ে দিতে পারে একজন ভুক্তভোগী রোগী। ফলে আপনি দুশ্চিন্তা, হতাশায় ভুগে থাকবেন। মনস্তাত্ত্বিক বিভিন্ন সমস্যা আপনার মাঝে দেখা দেবে। নিদ্রাহীনতা চলে আসবে আপনার মাঝে। রাতের মতো রাত যাবে, কিন্তু শান্তির ঘুম আর আসবে না।

অবশ্যই আমি সাধারণভাবে বলতে চাই, প্রতিটি মানুষ ভিন্ন। তারা এক নয়। আলাদা। কিন্তু কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকে, যেসব ফুটে ওঠে একজন আত্মমর্যাদাহীন ব্যক্তির মাঝে। ওপরে বেশকিছু বৈশিষ্ট্য আমি ইতোমধ্যেই উল্লেখ করেছি।

অপরদিকে, আত্মমর্যাদাবান মানুষেরা প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসের অধিকারী হয়ে থাকে। তারা নিজের মাঝে সাহস খুঁজে পায়। তারা নিজেদের সকল কাজ গুরুত্বের সাথে করে। এই মানুষগুলো কাজ করে। চলার পথে ভুল করে। কিন্তু ভুলের ওপর অটল থাকে না। তারা নিজেকে বদলে নেয়। ভুল থেকে শেখে। প্রতিনিয়তই একজন আত্মমর্যাদাবান মানুষ নিজের গ্রোথ নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে, সুযোগকে কাজে লাগায়। নতুন নতুন সেক্টর থেকে শেখে। মানুষের সমালোচনা তাদেরকে পিছু ফেলতে পারে না। সমালোচনাকে সুন্দরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং সমালোচনার মুখোমুখি হওয়ার পরও মানুষের প্রতি, জীবনের প্রতি ইতিবাচক চিন্তাচেতনা অব্যাহত থাকে তাদের। একজন আত্মমর্যাদাবান মানুষ কখনোই নিজের ভুল স্বীকার করতে কার্পণ্য করেন না। নিজের দুর্বলতাকে তারা জানান দেন এবং সবসময়ই বর্তমানকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকেন। তাই একজন আত্মমর্যাদাবান ব্যক্তি হওয়া মানেই নিজেকে নিয়ে সুখী থাকা, শান্তি অনুভব করা এবং ক্রমাগত জীবন চলার পথে ভালো সকল বিষয়কে আঁকড়ে ধরা। আপনি যদি একজন আত্মমর্যাদাবান মানুষ হতে পারেন, তাহলে আপনার মাঝে সবসময়ই জীবনকে উপভোগ করার অপশন থাকবে ইতিবাচক উপায়ে।

আত্মমর্যাদার এত সুন্দর ফলাফল দেখে সবার মনেই প্রশ্ন জাগার কথা, আমি কীভাবে নিজের আত্মমর্যাদাকে নিচু থেকে উঁচু স্তরে নিতে পারবো? কীভাবে আমি নিজেকে অসুস্থ জীবনাচরণ থেকে বদলে সুস্থতার সাথে বেঁচে থাকতে সক্ষম? অথবা কীভাবে আমি নিজের মাঝে আত্মমর্যাদা ধরে রাখবো? কেননা আমি খুব হতাশ, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।

দুর্ভাগ্যবশত, আত্মমর্যাদার দিকে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই আমাদের সবারই প্রচুর পরিমাণে কাজ করার রয়েছে। আত্মমর্যাদাকে উন্নীত করার জন্য নানা ধরণের উপায় অবলম্বন করা যেতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, আত্মমর্যাদাকে উন্নীত করার ক্ষেত্রে আমাদের হাতে এত কাজ কেন রয়েছে? কারণটা একেবারে সহজ। শৈশব থেকে কৈশোর পর্যন্ত নিজের আত্মমর্যাদাকে উন্নীত করা, নিজের বিশ্বাসকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে আমরা খুব কমই কাজ করেছি। অথবা আমরা একেবারেই কাজ করিনি। আমরা পড়ার জন্য পড়েছি। স্কুল কলেজ অতিক্রম করেছি। কিন্তু নিজের মনে শিক্ষাকে ধারণ করে শক্তিশালী মানুষ হতে পারিনি। অথচ আত্মমর্যাদাও আমাদের শিক্ষার জরুরী অংশ। আমরা চলার পথে বাবা-মা, শিক্ষক অথবা অন্যদেরকে সবসময়ই দোষারোপ করেছি। এটা আমরা করেছি, কারণ আমরা কম আত্মমর্যাদাবান মানুষ। আত্মমর্যাদা না থাকার ফলেই নিজের বাইরে গিয়ে অন্যকে দোষারোপ করতে থাকে মানুষ। এই কাজটি কখনোই আমাদের আত্মমর্যাদাকে উন্নীত করতে সাহায্য করে না প্রকৃতার্থে।

তাই আমাদেরকে দায়িত্ব নিতে শিখতে হবে। আমাদের জীবনের সবকিছুর দায়িত্ব নিতে হবে। আমাদেরকে বুঝতে হবে অতীতে যা ই হয়েছে, যতটুকু খারাপ ই হয়েছে, আমরা আমাদের জীবনের গল্পকে নতুনভাবে লিখতে পারি। হ্যা, চাইলেই পারি আমরা। এ ব্যাপারে সবচাইতে উত্তম চিন্তা হচ্ছে- নিজের জীবনকে বদলে ফেলার কোন গুপ্ত রহস্য নেই। আমরা নিজের বিশ্বাস, নিজের মতামত, সিদ্ধান্তকে বদলে ফেলার মাধ্যমে জীবনকে সুন্দর করতে পারি। এসবই আমাদেরকে সফল করে তুলতে পারে।

‘আমি যথেষ্ট ভালো নই’ ‘আমার সাথে কোনকিছুই ভালো ঘটে না’ ‘আমি ভালো কোনকিছুই ডিজার্ভ করি না’ ‘আমার সাথে ঘটে যাওয়া কোনকিছুতেই আমি রুখতে পারি না’ ‘আমি একজন ভিকটিম এবং আমার কোন ক্ষমতা নেই’ ‘কিছু কিছু মানুষের কপালটাই খারাপ’- এমন হাজারও ক্ষতিকর এবং আত্মঘাতি চিন্তাচেতনা থেকে আপনাকে বের করে নিয়ে আসতে হবে নিজেকে। আপনাকে পেতে হবে মুক্তি।

আপনি যদি নিজেকে আত্মমর্যাদাবান করে তোলার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন এবং সময় দেন, তাহলে পুরস্কার হিসেবেও চমৎকার সব ব্যাপার আপনার হাতে আসবে। এই যেমন- আপনি প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস অনুভব করবেন নিজের মাঝে, সামাজিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হবে, আপনার কর্মক্ষেত্রের সবার সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠবে এবং নিজেকে আপনি সুখী করে তুলতে পারবেন। শুধু নিজেকেই নয়, অপরাপর সকল মানুষকেও আপনি সুখী করতে পারবেন, যারা আপনার সাথে সংযুক্ত রয়েছে। এমনকি লোকের সমালোচনা আপনার কিছুই করতে পারবে না। এরপর থেকে আপনি নিজের সকল মতামত, অনুভূতি, চিন্তাচেতনাগুলো স্বতস্ফূর্তভাবে মানুষের সামনে প্রকাশ করতে পারবেন। কারণ এগুলো আর অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না তখন। আপনার নিজেকে প্রকাশ করার হাজারও উপায়ে উন্মুক্ত হয়ে যাবে, যখন আপনি নিজেকে আত্মমর্যাদাবান করে তুলতে পারবেন। এমনকি আপনি দুশ্চিন্তা, হতাশা এবং জীবনে আগত সকল কঠোর পরিস্থিতিকে সহজেই মোকাবেলা করতে পারবেন। আপনার জীবন হবে সুখ শান্তিময়। ব্যাপারটা বেশ সুন্দর, তাই না?

‘লাভ ইয়োরসেলফ ফার্স্ট’ বই থেকে নেয়া অংশবিশেষ। বইটি পড়ুন। জীবন সুন্দর হবে নিশ্চিতভাবেই। ত্বাইরান আবিরের অনুবাদকৃত বইটি দেশের যেকোন অনলাইন বুকশপ থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন। হ্যাপি রিডিং!

শেয়ার করুনঃFacebookTwitter
আলোচনায় যোগ দিন

Instagram

Instagram has returned empty data. Please authorize your Instagram account in the plugin settings .