কেমন ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ? আসুন জানা যাক….

একবার তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে ভুট্টো বলেছিলো-

‘আলোচনার বৈঠকে মুজিবকে আমি ভয় পাই না। ইমোশনাল এ্যাপ্রোচে মুজিবকে কাবু করা যায়, কিন্তু তার পেছনে ফাইল বগলে চুপচাপ যে নটোরিয়াস লোকটি বসে থাকে তাকে কাবু করা শক্ত। দিস তাজউদ্দীন, আই টেল ইউ, হি উইল বি আওয়ার মেইন প্রবলেম।’

আমাদের এই ভূমিতে দেশের জন্য কাজ করা প্রত্যেকটা মানুষের ওপর যেই খড়গ নেমে আসে সেই খড়গটা তাজউদ্দীন আহমদের ওপরই পড়েছিলো সবার আগে। সেটা হচ্ছে তাকে বারবার নাস্তিক, পারতপক্ষে হিন্দু প্রমাণের চেষ্টা। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সামরিক বাহিনী লিফলেট ছড়াতো ‘তাজউদ্দীন ভারতে গিয়া হিন্দু হইয়াছেন…’।

যারা মুক্তিযুদ্ধের সময়ের দৈনিক সংগ্রামের লেখাগুলো পড়েছেন তারা ভালো করেই জানেন পুরোটা একাত্তর জুড়ে তাজউদ্দীন আহমদকে তারা ‘শ্রী তাজউদ্দীন’ লিখতো। গোলাম আজম সংগ্রামের সম্পাদকীয় লিখেছিলো ‘বাংলাদেশ বাঙালীদের দ্বারা শাসিত হবে- এ মতবাদ শ্রী তাজউদ্দীনের……’

মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার তার এক কলামে একবার লিখেছিলেন- ‘বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সময়ের পার্থক্য সবসময়ই ছিলো ৩০ মিনিট। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার ভারতের মাটিতে থেকে কাজ করতো, চলতো ভারতের সময়ে। কিন্তু তাজউদ্দীন আহমদ কোনদিন তার হাতঘড়ির সময় পরিবর্তন করেননি, সেটি চলতো বাংলাদেশের সময়ে।

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস পাকিস্তানি দানবেরা এই দেশের মাটিতে ঘাঁটি গেড়ে বসেছিলো। তখন আকাশে শকুন উড়তো, নদীর পানিতে ভেসে বেড়াতো ক্ষত-বিক্ষত মৃতদেহ, শুকনো মাটিতে দাউ দাউ করে জ্বলতো আগুনের লেলিহান শিখা, বাতাস ভারী হয়ে থাকতো স্বজনহারা মানুষের কান্নায়। শুধু বাংলাদেশের সময়টুকু তারা কেড়ে নিতে পারেনি। তাজউদ্দীন আহমেদ পরম মমতায় সেই সময়টুকু তার হাতঘড়িতে ধরে রেখেছিলেন।

ঘাতকের বুলেট তাজউদ্দীন আহমদের হৎস্পন্দনকে চিরদিনের জন্য থামিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তার হাতের ঘড়িতে ধরে রাখা বাংলাদেশের সময়কে কোনদিন থামাতে পারবে না। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন তাজউদ্দীন আহমদের ঘড়ি আমাদের হৃদয়ে টিকটিক করে চলতে থাকবে। চলতেই থাকবে।’

একবার বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারার সাথে মিটিং-এ বসেছেন তাজউদ্দীন আহমদ। প্রাথমিক আলোচনার পর বিস্তারিত আলোচনার জন্য ম্যাকনামারা জানতে চাইলেন- ‘বাংলাদেশের জন্য কোথায় কী ধরনের সাহায্য দরকার?’
জবাবে তাজউদ্দীন আহমদ বললেন-‘আমাদের যা দরকার তা আপনি দিতে পারবেন কি-না আমার সন্দেহ আছে।’
ম্যাকনামারা বললেন- ‘মিস্টার মিনিস্টার, আপনি বলুন, আমরা চেষ্টা করবো দিতে।’

তখন তাজউদ্দীন আহমদ বললেন- ‘মিস্টার ম্যাকনামারা, আমার গরু এবং দড়ি দরকার।
যুদ্ধের সময় গরু সব হারিয়ে গেছে। এখানে-ওখানে চলে গেছে, মরে গেছে। পাকিস্তান যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, চাষিরা এদিক-সেদিক পালিয়ে গেছে, তখন গরু হারিয়ে গেছে। এখন যুদ্ধ শেষ, চাষি ফিরেছে কিন্তু গরু নাই, তাই চাষ করবে কীভাবে? কাজেই আমাদের অগ্রাধিকার চাহিদা হলো গরু।’

এ কথা শুনে ম্যাকনামারার চোখ-মুখ লাল হয়ে গেলো, তাজউদ্দীন আহমদ বলে চললেন- ‘আর আমাদের সমস্ত দড়ি তো পাকিস্তানিরা নষ্ট করে ফেলেছে, এখন গরু পেলে গরু বাঁধতে দড়ি প্রয়োজন। গরু এবং দড়ি প্রয়োজন খুব তাড়াতাড়ি, না হলে সামনে জমিতে চাষ হবে না।’

অস্বস্তিকর এই মিটিং শেষে যখন তাজউদ্দীন আহমদকে জিজ্ঞেস করা হল, কেন তিনি এরকম করলেন? উনি তখন বললেন- ‘কেন? গরু ছাড়া কি চাষ হয়? আর এই লোকটাই তো আমেরিকার ডিফেন্স সেক্রেটারি ছিলেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিলো আমেরিকা। আমাদেরকে স্যাবোটাজ করেছে। শেষ পর্যন্ত সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছে আমাদেরকে ধ্বংস করে দিতে। আর তার কাছে সাহায্য চাইবো আমি?’

যুদ্ধ শেষে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতায় আগুনে পোড়া নিজের পৈত্রিক ভিটার সামনে এসে দাঁড়ালে সমবেত জনতা বলে ওঠে- আর চিন্তা কি, তাজউদ্দীন ভাইসাবের পোড়া ভিটায় নতুন বাড়ি উঠবে।

তিনি তখন বলেছিলেন- ‘যতদিন পর্যন্ত এই বাংলাদেশের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই না হবে, ততদিন এই ভিটায় বাড়ি উঠবে না।’

সেই ভিটায় বাড়ি আর উঠেনি।

‘আমি দেশের জন্য এমনভাবে কাজ করবো যেন, দেশের ইতিহাস লেখার সময় সবাই এদেশটাকেই খুঁজে পায়; কিন্তু আমাকে হারিয়ে ফেলে। মুছে যাক আমার নাম, তবু বেঁচে থাক বাংলাদেশ।’

শুভ জন্মদিন হে বাংলার তাজ! শ্রদ্ধার সাথে আপনাকে স্মরণ করছি।

মূল লেখা- সংগৃহীত
ঈষৎ সম্পাদনা- ত্বাইরান আবির


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *