চে গুয়েভারা- জনসাধারণের মহানায়কের গল্প

আজকে একজন কিংবদন্তীর গল্প শুনুন। এমন একজন কিংবদন্তী মহানায়ক, যারা পৃথিবীর বুকে শত বছরে দেখা দেন। এমন একজন বিপ্লবী, যারা ত্যাগ ও সাহসিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে যান। তিনি আর্নেস্ত চে গুয়েভারা। আর্জেন্টাইন বিপ্লবী। সমাজতন্ত্রের ঝান্ডাধারী একজন সৈনিক।

সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের করাল গ্রাসে যখন নিপীড়নের মুখে সমাজের নিম্ন শ্রেনীর মানুষ, শ্রেণী বৈষম্য যখন চরমে পৌঁছে গিয়েছিলো, সেই কষ্ট নাড়া দিয়েছিলো চে গুয়েভারাকে। তখনও তিনি বিপ্লবী নন, একজন সেবক, একজন ডাক্তার। প্রশ্ন হচ্ছে, একজন ডাক্তার কীভাবে বিপ্লবী হয়ে উঠলেন? কেন নিজের স্বার্থ ও সুন্দর ভবিষ্যতকে জলাঞ্জলি দিয়ে প্রাণ বিলিয়ে দিলেন সাধারণ মানুষের জন্য?

এর উত্তর একটাই- নিপীড়িত মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা, জুলুমের বিরুদ্ধে তার ন্যায় প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা, জালিম শক্তিকে পৃথিবী থেকে দূর করার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা। মজলুমের পক্ষে তাই জালিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়েছিলেন চে গুয়েভারা। বিপ্লবকে ছড়িয়ে দিতে মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে গিয়েছিলেন তিনি।

সম্ভ্রান্ত পরিবারের একজন মানুষ হয়েও শেষ পর্যন্ত নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন চে। পুঁজিবাদের করাল গ্রাস, তথা অর্থ দিয়ে চালিত সমাজ যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে চে গুয়েভারা সেটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পুঁজিবাদী সমাজে নিম্ন শ্রেনীর মানুষেরা কেবল গিনিপিগ, এবং কাস্টোমার। কখনো কখনো নিম্ন শ্রেনীর মানুষের সমষ্টি হয়ে ওঠে মার্কেটপ্লেস।

এই মানুষদের ওপর চলে অত্যাচার, চলে বাজার, চলে এক্সপেরিমেন্ট, যা মোটেই ভালো ব্যাপার নয়। নিম্ন শ্রেনীর হওয়াতে বৈষম্যের শিকার হয় তারা। সুযোগ সুবিধা পায় না। প্রভাব থাকে না কোন সমাজে তাদের। এভাবে সমৃদ্ধি পাওয়ার পথটাও বন্ধ হয়ে যায়। টাকার প্রভাবে চলতে থাকে সকল সেক্টর।

সাধারণ মানুষের এই দুর্দশা চে গুয়েভারার মনে প্রচন্ড কষ্ট দিয়েছিলো এবং ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলো মনে। তাই পুঁজিবাদের টাকার প্রভাব সরিয়ে সাম্যের আদর্শে সমাজতন্ত্রের মাঝে সকল মানুষকে আনতে চেয়েছিলেন চে গুয়েভারা। রীতিমতো যুদ্ধে জড়িয়ে গিয়েছিলেন একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য।

এমন একটি সমাজ কায়েম করতে চেয়েছিলেন চে গুয়েভারা, যেখানে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সমতা বজায় থাকবে। এমন সমাজ কায়েম করতে চেয়েছিলেন তিনি, যেখানে ব্যক্তির পুঁজিবাদী মালিকানা ও স্বার্থান্বেষী ভোগদখল থাকবে না। এমন এক সমাজ, যেখানে সকল মানুষ তার যোগ্যতা অনুসারে সমান সুযোগ সুবিধা পাবে এবং যোগ্যতার মূল্যায়ন করা হবে, অসদুপায়ে টাকা দিয়ে অধিকার বঞ্চিত করা সম্ভব হবে না কাউকে। এমন সমাজের স্বপ্নেই বিভোর ছিলেন চে গুয়েভারা। এমন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই কাজ করেছেন। প্রশ্ন জাগতে পারে, এই জটিল লক্ষ্য ও বিপ্লবের শুরুটা কীভাবে হয়েছিলো? শুনুন তাহলে বলছি।

চে গুয়েভারা তখন তরুণ বয়সের একজন ছাত্র। মেডিকেলের স্টুডেন্ট হিসেবে চে সমগ্র লাতিন আমেরিকা ভ্রমণ করেছিলেন। এই সময় এই সব অঞ্চলের সর্বব্যাপী দারিদ্র্য তার মনে গভীর রেখাপাত করে। এই ভ্রমণকালে তার অর্জিত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এই অঞ্চলে বদ্ধমূল অর্থনৈতিক বৈষম্যের স্বাভাবিক কারণ হল একচেটিয়া পুঁজিবাদ, নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ; এবং এর একমাত্র সমাধান হল সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিশ্ব বিপ্লব। এই বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে চে গুয়েভারা রাষ্ট্রপতি জাকোবো আরবেনজ গুজমানের নেতৃত্বাধীন গুয়াতেমালার সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫৪ সালে সিআইএ-এর ষড়যন্ত্রে গুজমানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলে চে-র বৈপ্লবিক আদর্শ চেতনা বদ্ধমূল হয়। পরবর্তীকালে মেক্সিকো সিটিতে বসবাসের সময় তার সঙ্গে রাউল ও ফিদেল কাস্ত্রোর আলাপ হয়। চে তাদের ছাব্বিশে জুলাই আন্দোলনে যোগ দেন। মার্কিন-মদতপুষ্ট কিউবান একনায়ক ফুলগেনসিও বাতিস্তাকে উৎখাত করার জন্য গ্রানমায় চড়ে সমুদ্রপথে কিউবায় প্রবেশ করেন। অনতিবিলম্বেই চে বিপ্লবী সংঘের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড পদে তার পদোন্নতি হয় এবং বাতিস্তা সরকারকে উতখাত করার লক্ষ্যে দুই বছর ধরে চলা গেরিলা সংগ্রামের সাফল্যের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

কিউবার বিপ্লবের পর চে নতুন সরকারে একাধিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, বিপ্লবী আদালতে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্তদের আপিল পুনর্বিবেচনা ও তোপচিদল কর্তৃক মৃত্যুদণ্ড প্রদান, শিল্পোদ্যোগ মন্ত্রী হিসেবে খামার সংস্কার আইন প্রবর্তন, কিউবার জাতীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক বাহিনীর ইনস্ট্রাকশনাল ডিরেক্টরের ভূমিকা পালন, এবং কিউবান সমাজতন্ত্রের প্রচারে বিশ্বপর্যটন। এই পদাধিকারের কল্যাণে তিনি মিলিশিয়া বাহিনীকে প্রশিক্ষণ প্রদানের সুযোগ পান; ফলত এই বাহিনী পিগস উপসাগর আক্রমণ করে তা পুনর্দখলে সক্ষম হয়। কিউবায় সোভিয়েত পরমাণু ব্যালিস্টিক মিসাইল আনার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। চে ছিলেন এক বিশিষ্ট লেখক ও ডায়েরি-লেখক। গেরিলা যুদ্ধের উপর তিনি একটি প্রভাবশালী ম্যানুয়েল রচনা করেন। তরুণ বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকায় মোটরসাইকেলে ভ্রমণের স্মৃতিকথাটিও তার অত্যন্ত জনপ্রিয় রচনা। বৃহত্তর বিপ্লবে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি ১৯৬৫ সালে কিউবা ত্যাগ করেন। প্রথমে কঙ্গো-কিনসহাসায় তার বিপ্লব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর তিনি বলিভিয়ায় বিপ্লবে অংশ নেন। এখানেই সিআইএ-মদতপুষ্ট বলিভীয় সেনাদের হাতে বন্দী ও নিহত হন চে।

চে গুয়েভারা একাধারে ইতিহাসের এক নন্দিত ও নিন্দিত চরিত্র। বিভিন্ন জীবনী, স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ, তথ্যচিত্র, গান ও চলচ্চিত্রে তার চরিত্রের নানা দিক ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। টাইম পত্রিকার বিংশ শতাব্দীর সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী ১০০ জন ব্যক্তির তালিকায় তার নাম প্রকাশিত হয়। আবার গেরিইয়েরো এরোইকো নামে আলবের্তো কোর্দার তোলা চে-র বিখ্যাত আলোকচিত্রটিকে “বিশ্বের সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ আলোকচিত্র” হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

চে গুয়েভারা কিউবান ভাষায় লিখেছেন প্রায় ৭০টি নিবন্ধ, ধারণা করা হয় ছদ্মনামে কিংবা নামহীন অবস্থায় লিখেছেন ২৫টি। এছাড়া তিনি লিখে দিয়েছেন পাঁচটি বইয়ের ভূমিকা। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত ভাষণ আর সাক্ষাৎকার দিয়েছেন প্রায় ২৫০-এর কাছাকাছি। বিভিন্ন ব্যক্তিত্বকে লেখা তার অসংখ্য চিঠির মধ্যে সংগৃহিত আছে ৭০টির মতো। তার লেখালেখি নিয়ে এখন পর্যন্ত বের হয়েছে নয় খণ্ড রচনাবলি।

তথ্য কৃতজ্ঞতা- উইকিপিডিয়া

সম্পাদনা, তথ্য সংযোজন ও পুনঃলিখন-

ত্বাইরান আবির
লেখক, অনুবাদক, কনটেন্ট রাইটার


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *