মিস্টার রেহমানের মৃত্যু

“আপনি হয়তো খুব ভালো আছেন। কিন্তু কখনো রাস্তার ধারে কাজের অপেক্ষায় বসে থাকা মানুষের দিকে তাকিয়েছেন?

কখনো কি গভীর দৃষ্টি নিয়ে হাত পা বিহীন কোন মানুষের দিকে তাকিয়েছেন?

কখনো কি রোদে পোড়া মলীন চেহারা নিয়ে পরিশ্রম করা মানুষগুলোর দিকে তাকিয়েছেন?

কিংবা কখনো লক্ষ্য করেছেন কোন পথশিশুর নির্মম সংগ্রাম?

হয়তো আপনি এসব মানুষের দিকে তাকিয়েছেন। রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় আপনার চোখ পড়েছে তাদের দিকে। কিন্তু কখনোই গভীর দৃষ্টিতে বোঝার চেষ্টা করেননি তাদের অনুভূতি। কখনোই দেখার চেষ্টা করেননি কতটা অসহায়ত্ব খেলা করে তাদের চোখে।

আপনি যখন নিজের ছোট্ট বাড়িতে বসবাস করছেন, ঠিক একই সময়ে এই মানুষগুলো দিন কাটাচ্ছে খোলা আকাশের নিচে, কিংবা কোন ঘুপচি ঘরে। এমন জায়গায় তাদের বসবাস, যেখানে হয়তো আপনি এক সেকেন্ডও থাকতে পারবেন না। ঐ পরিবেশে আপনাকে ছেড়ে দিলে হয়তো আপনি ঘেন্নায় দৌড়ে চলে আসবেন। সেই পরিবেশে দাঁড়িয়েই কীভাবে মানুষগুলো দিনের পর দিন সংগ্রাম করে যায়, নিজের জীবন চালাতে থাকে, ভেবেছেন কখনো?

আপনার বাবা আপনাদেরকে টাকা দেয়, উপহার দেয়। শৈশবে বাবার কাজ শেষে ফেরার পর কারো কারো ক্ষেত্রে হয়তো এমনও হয়েছে যে, বাবা অনেক কিছুই নিয়ে আসতেন। কখনো ফলমূল, কখনো চকলেট, কখনো আবার নানা ধরণের উপহার সামগ্রী। অথচ পথশিশুদের অনেকেই বাবা মা হারিয়ে বসেছে। কেউ কেউ হয়তো নিজের জন্ম পরিচয়ও জানে না। তাদের জন্য কেউ কিছু নিয়ে বাড়ি ফেরে না। হয়তো তারাও অপেক্ষা করে আপনার মতই।

আপনি যেই সময়ে সুন্দর বাড়িতে, ঘরে সুন্দর পরিবেশে আরাম করে দিন কাটান, ঠিক একই সময়ে কোন এক পিতা তার সন্তানের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিবে বলে রাস্তায় দাঁড়ায়। ভাড়া করা রেটে একেকটা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। শরীরের হাল নষ্ট হয়, তবুও ক্লান্তি তাদের ছুঁতে পারে না। কপালের ঘাম বারবার মুছে তারা কাজ করতে থাকে। লক্ষ্য একটাই- আজকের দিনের জন্য দুমুঠো ভাতের ব্যবস্থা করা। স্ত্রী সন্তান আজকের দিনটা খেতে পারবে, এই নিশ্চয়তাটাই তার কাছে বিশ্বজয়ের সমান।

যেই বয়সে আপনি প্রেমে ব্যর্থ হয়ে হতাশ হচ্ছেন, চাকরী নেই চাকরী নেই বলে আফসোস করছেন, ঠিক একই বয়সে কোন এক ছেলে তার নিজের পুরো পরিবারের ভার একাই বহন করে চলে, কেউ আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান। অথচ আপনি বাস্তবতার মাঠে না নেমে বলতে থাকেন- হচ্ছে না, আমি পারবো না, আমার দ্বারা হবে না কিংবা আমার ভাগ্য খারাপ! কাজে দক্ষতা অর্জন ও কাজ খোঁজার চেয়ে ভাগ্যকে দোষারোপ করার দিকেই আপনার বেশি নজর থাকে।

আপনার অনেক কিছুই আছে। অথচ আপনি আপনার ছোট্ট কিছুর অভাব নিয়ে আফসোস করতে করতে নিজের সুখটাকেও বিলীন করে দেন। আপনি সুস্থ, আপনার হাত পা আছে, মেধা আছে। তবুও আপনি নিজেকে এমন কিছুর জন্য হতাশায় ডুবিয়ে রাখেন, যেটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। চিন্তা করুন তো, কী অবস্থা হতো-

যদি আপনার কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ না থাকতো!
যদি আপনি হতেন একজন পথশিশু!
কিংবা আপনাকে অমানুষিক পরিশ্রম করতে হতো!

একটু ভাবলেই আপনি বুঝতে পারবেন এমন হলে আপনার জীবন কেমন হতো! অথচ আপনি কত সুখে আছেন। আপনি নিজের জীবনের ঠুনকো অপূর্ণতা নিয়ে মেতে আছেন, সীমাহীন সম্ভাবনার দিকে না তাকিয়ে। এ কারণেই আপনি সুখ পান না। আপনি শুকরিয়া করতে জানেন না। আপনার যা আছে আপনি তা নিয়ে সন্তুষ্ট নন। হীনমন্যতা আপনার চিরসঙ্গী, হতাশা আপনার জীবনের চাদর। এই মুহূর্ত থেকে এসব বাদ দিয়েই চিন্তা করুন জীবন কত সুন্দর আপনার, কত সম্ভাবনা আপনার সামনে! আপনাকে কেবল চেষ্টা করতে হবে, নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে বলতে হবে- আমি পারবোই!”

এইটুকু লিখেই ক্ষান্ত দিলেন ডক্টর রেহমান। এরপর আর কলম চালাতে পারলেন না তিনি। কেননা, পরের সেকেন্ডেই ঘোলাটে হয়ে এলো তার চোখমুখ, জমাটবদ্ধ অন্ধকারে ভেসে তিনি হারিয়ে গেলেন না ফেরার দেশে। একদিন আগেও বেঁচে থাকা ডক্টর রেহমানকে নিয়ে ঠিক পরেরদিনই পড়ে যাবে শোকের রোল। এটাই জীবন। এমন জীবনের কথাই বলে গিয়েছিলেন আজীবন ডক্টর রেহমান। চারদিন পর ডক্টর রেহমানের সম্মাননা নেয়ার কথা। আফসোস সেইদিনই অনুষ্ঠিত হবে তার কুলখানি। কলম থাকবে, কাগজ থাকবে, কিন্তু থাকবেন না মিস্টার রেহমান। মেঝেতে পড়ে থাকা তার নিথর দেহ সেই কথারই জানান দিচ্ছে।

 

লেখকঃ ত্বাইরান আবির (লেখক, অনুবাদক, কনটেন্ট রাইটার)


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *