জীবন নিয়ে অভিযোগ করলে কী লাভ?

১। আমার এটা নেই, আমার ওটা নেই
২। এটা ঠিক হলো না, ওটা ভালো হয়নি
৩। আমার ভাগ্যটাই খারাপ!
৪। আমার জীবন এমন কেন!?
৫। মানুষ আমার সাথে কেন এমন করে!?

এই ধরণের কথাবার্তা আমরা প্রায় সময়ই বলে থাকি। আরো সহজ করে বলতে গেলে নিজের জীবন নিয়ে আমাদের অভিযোগের শেষ নেই। সবকিছু ঠিকমতো সম্পন্ন হলেও, কোথায় যেন একটু খামতি রয়েছে, এমন ভাবনা চলতে থাকে আমাদের মনে। খুব করে নিজের মানুষকে কাছে পাওয়ার পরও কখনো কখনো মনে হতে থাকে আমি হয়তো আরো ভালো কাউকে ডিজার্ভ করতাম! (যদি কখনো ঝগড়া লাগে আরকি)। এমনটা কেন হয় বলুন তো? কারণ আপনার মাঝে সন্তুষ্টি নেই। এই সন্তুষ্টি আবার কী জিনিস? সন্তুষ্টি হচ্ছে, আপনার যা আছে তা নিয়ে সুখী হওয়া, নিজেকে ছোট মনে না করা, সবসময়ই ইতিবাচক থাকা। একটা কথা মনে রাখবেন- কোন মানুষ কখনোই আপনাকে ঠিকমতো বুঝতে পারবে না, জীবন কখনোই আপনাকে সমানভাবে সব দেবে না। তাহলে জীবন ও মানুষ নিয়ে অভিযোগ করে দিনশেষে কী লাভ? কোন লাভ নেই। এসব করে উল্টো আপনার মন খারাপ হওয়ার বেশিকিছু হবে না। তাই অভিযোগ করা বাদ দিন। আপনার নিজের চাইতে ভালো আপনাকে কেউ বুঝবে না, আপনি নিজে যা আছেন সেটাই আপনার আসল অবস্থান। সম্ভব হলে নিজের অবস্থানকে পরিবর্তন করুন। জানেন তো, নদীর ওপাড়ে তাকালে সবকিছুই সুন্দর মনে হয়। ওপাড়ে পৌঁছে দেখুন, তখন বলবেন, আমার এই পাড়ই ভালো ছিলো। এটাই আসলে জীবন। আপনাকে সবসময়ই সব সমানভাবে দেয়া হবে না। তাই বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ করা বাদ দিয়ে একটু ইতিবাচক হয়ে নিজেকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন। এটাই বরং আপনার জন্য ভালো হবে। লেখক জেফ কেলারকে এই ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে, তিনি একটি গল্প জানিয়েছিলেন ‘জীবন নিয়ে অভিযোগ না করা’ প্রসঙ্গে। চলুন গল্পটি জানা যাক। আশা করি আপনাদের জন্য শিক্ষনীয় হবে।

“সম্প্রতি আমি আমার অফিসে বসে ব্যবসায়িক কিছু বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করছিলাম। ব্যবসার নানাদিক ঠিকমতো চলছিলো না। তাই আমি একটু চিন্তিত ছিলাম। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন ব্যবসা সবসময় একরকম চলে না। আমার ক্ষেত্রেও একই বিষয় ঘটেছিল। কিন্তু আমি স্বীকারোক্তি দিতে পারি, এসব নিয়ে আমি খুব কমই অভিযোগ করেছি। তো আমি যখন আনমনে চিন্তাভাবনা করছিলাম, তার ঠিক একটু পরই পেড্রো নামের এক ছেলে আমার রুমে প্রবেশ করলো। তার বয়স প্রায় বিশ বছর এবং প্রায় ছয় বছর আগে সে হন্ডুরাস থেকে এদেশে এসেছিলো। এখন সে একটি কোম্পানিতে কাজ করে। উক্ত কোম্পানির কাজ হলো বিভিন্ন বাসাবাড়ি এবং অফিস পরিস্কার করা। আপনি যদি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির দারুণ এক মানুষ দেখতে চান, তাহলে পেড্রোই আপনার জন্য চমৎকার উদাহরণ। সে ঠিক অমনই একজন মানুষ! তার চেহারায় সবসময় হাসি লেগেই থাকে। ঐদিন আমি পেড্রোকে তারই জন্মভূমিতে আঘাত হানা হারিকেন মিচ এবং এর প্রভাব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছিলাম। এটা শুনে তৎক্ষনাৎ তার মুখ থেকে হাসি সরে গেলো। সে তখন আমাকে প্রলয়ঙ্কারী হারিকেনের তান্ডব সম্পর্কে বিস্তারিত বললো।

হারিকেন মিচের কারণে হাজার হাজার লোক মারা গিয়েছে এবং লাখ লাখ লোক গৃহহারা হয়েছে। পেড্রো আমাকে আরো বললো, তার বাবা মা তখনও হন্ডুরাসে বসবাস করছিলো এবং কেউই জীবিত পরিবারের সাথে কোনভাবেই যোগাযোগ করতে পারছিলো না। কেননা, ঐ অঞ্চলের নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো। পেড্রো খুবই মর্মাহত ছিলো এসব নিয়ে চিন্তা করে। সে বললো- ‘প্রতিদিনই আমি আমার পরিবার নিয়ে চিন্তা করি।’ আচ্ছা, একজন লোক জানে না তার পরিবারের সদস্যরা জীবিত আছে নাকি মারা গেছে- এই ব্যথাটা কতটুকু কষ্টকর ভাবতে পারেন? পেড্রোর জানা নেই তার বাবা-মা মৃত নাকি জীবিত। পরিবারের সাথে যোগাযোগ করার কোন সুযোগও ছিলো না তার হাতে। তবুও সে ভেঙে পড়েনি। নিজেকে শক্তিশালী করে রেখেছে।

এরপর পেড্রো আমাকে জানালো সে হন্ডুরাসের মানুষদেরকে সাহায্য করার জন্য নিজের তরফ থেকে যতটুকু পারে কাজ করে যাচ্ছে। খাবার, কাপড়চোপড় এবং টাকা সংগ্রহ করছে সে। তাছাড়া কিছু রিলিফ অর্গানাইজেশনের সাথেও যুক্ত হয়েছে। নিজের যাবতীয় সমস্যা নিয়ে বিলাপ করা বাদ দিয়ে পেড্রো তার সামর্থ্য অনুযায়ী ক্ষতি দূরীকরণে কাজ করে চলেছে। পেড্রোর সাথে কথা বলার পর আমি বুঝতে পারলাম তার তুলনায় আমার সমস্যা কোনকিছুই না। এবং আমি খুবই সৌভাগ্যবান! সারাটাদিন এরপর আমি নিজেকে স্থির রেখে কাটিয়ে দিলাম। আমার আর একটুও খারাপ লাগছিল না। যাহোক, আমি এর ঠিক কয়েক সপ্তাহ পর পুনরায় পেড্রোর দেখা পেলাম। বরাবরের মতই তার গালে রাজ্যজয়ী সেই হাসি লেগেই ছিল এবং আনন্দের সংবাদ হচ্ছে তার পরিবারের সবাই তখনও বেঁচে ছিল। কিন্তু দুখঃজনক বিষয় হচ্ছে, হারিকেনের তান্ডবে তারা তাদের সবকিছু হারিয়ে ফেলেছিলো এবং একটি আশ্রয়কেন্দ্রে বাস করছে আপাতত। আমি জানি না তিল তিল করে গড়ে ওঠা নিজের সবকিছু অকস্মাৎ জীবন থেকে হারিয়ে গেলে কতটা কষ্ট লাগতে পারে। কিন্তু আমি তা একটু হলেও অনুভব করতে পারি। এই কষ্ট আসলেই মারাত্মক! তবুও পেড্রোর চেহারায় আমি দুঃখের লেশমাত্র দেখিনি। আমি জানি দুঃখ করার মতো, হতাশ হবার মত বহু বিষয় রয়েছে পেড্রোর। কিন্তু সে হতাশ হয়নি। কারণ, তার ধারণা, অভিযোগ আর বিলাপ করা মানেই সময় নষ্ট এবং শক্তি হ্রাস। তাই এসব করা থেকে সে সবসময়ই বিরত থাকতো। পেড্রো তোমাকে ধন্যবাদ আমাকেও সকল বিষয়ে অভিযোগ করা থেকে বাঁচিয়ে দেবার জন্য।”

পেড্রোর ঘটনা জানার পর অন্তত সবার মনে এটুকু বোধোদয় হওয়ার কথা যে, জীবন নিয়ে কখনোই অভিযোগ করা ঠিক নয়। হয় জীবনকে বদলে দিন, নাহয় মেনে নিন। আপনার বিলাপে জীবনের কিছুই আসে যায় না, ট্রাস্ট মি! তাই অহেতুক জীবন, পরিবেশ ও মানুষ নিয়ে হাজারো অভিযোগ বাদ দিয়ে কাজে লেগে পড়ুন। একদিন হয়তো আপনার আকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আপনি দেখতে পাবেন। বেস্ট অব লাক!

 

© Tayran Abir


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *