আগুন নিয়ে খেলতে যাবেন না- শেখ মুজিবুর রহমান

২১ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৫ সাল। পাকিস্তান সংসদের সাংবিধানিক অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলায় আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার দাবি জানান……….

শেখ মুজিবুর রহমান- মাননীয় স্পিকার, আমি আপনাদের বিরুদ্ধে কিছুই বলিনি। তবুও যদি কোনভাবে ওই কথাটি (পূর্বে বলা কথা) আপনি প্রত্যাহার করে নিতে বলেন, তাহলে আমি তা প্রত্যাহার করে নেব। কিন্তু আপনি যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে অনুগ্রহ করে বলতে পারেন কেন তারা এই শব্দটি (বাঙালি) নিয়ে আপত্তি করে?

মাননীয় স্পিকার- আপনার অবশ্যই আপনার কথাগুলো প্রত্যাহার করা উচিত।

শেখ মুজিবুর রহমান- মাননীয় স্পিকার, আমি অবশ্যই প্রত্যাহার করে নেব। মাননীয় স্পিকার, আমি এখন আপনাকে পূর্ব বাংলার জনগণের অনুভূতিগুলো জানাবো। আমরা জনগণের সেসব পয়েন্টের ওপর নিশ্চয়তা পেতে চাই। আমার বিপক্ষ দলীয় বন্ধুরা প্রতিনিয়তই আমাদেরকে দোষারোপ করে, আমরা নাকি সংবিধানকে অমান্য করছি। অথচ তারা সম্পূর্ণ ভুল চিন্তাভাবনা করছে। এবার তাহলে সংবিধানের প্রসঙ্গে আসা যাক। আমরা সংবিধান মানতে রাজি। হাউজের সম্মুখে আমরা চাই এটা নিয়ে আপনারা বিশ্লেষণ করুন। আমাদের তা মানতে একেবারেই সমস্যা নেই। কিন্তু করাচিকে বিভক্ত করার আইন প্রণয়নের নামে এসব হচ্ছেটা কী?!! বন্ধুরা, আমি সাবধান করে দিচ্ছি। আগুন নিয়ে খেলতে যাবেন না। প্রতিটি বাঙালি এসব অন্যায় আইনের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। এমনকি নিজের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেবে, যেভাবে তারা সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য করেছে। তারা করাচি ছাড়বে না, করাচিকে পশ্চিম পাকিস্তান ইউনিটের অন্তর্ভুক্ত করাকেও সমর্থন দেবে না। আমরা এ সংক্রান্ত বিলের বিধানসমূহে দেখেছি যে, যদিও প্রশাসনিকভাবে করাচি কেন্দ্রীয় সরকারের অন্তর্ভুক্ত থাকবে, কিন্তু এটিকে একটি ইউনিটের অন্তর্ভুক্ত করা হবে জরুরী ভিত্তিতে। প্রশ্ন জাগে, কিভাবে আপনারা পাকিস্তানের জনগণের সাথে এমন ধাপ্পাবাজি করে চলেছেন? আপনারা একবার বলেন, করাচি প্রশাসনিকভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের অন্তর্ভুক্ত থাকবে, আরেকদিকে গভর্নর জেনারলকে ক্ষমতা দিয়ে দেন এর সীমানা নির্ধারণ করার জন্য। এমনকি এখন বলছেন, গাডাপও করাচির ভেতরেই। তাহলে আপনাদের কথামতো, সিন্ধুও করাচির অন্তর্ভুক্ত। মাননীয় স্পিকার, আমরা বৃহত্তর করাচি চাই। আমি আপনাকে একটি পয়েন্ট বলতে চাই, আর তা হলো বহু বছর ধরেই করাচিকে আমরা যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছি। এখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন এসেছে। এই যেমন-গ্রেট ব্রিটেন, আমেরিকা ইত্যাদি। তারা এখানে বসতি স্থাপন করেছে, ভূমি কিনেছে এবং নিজেদের বাসাবাড়ি ও দূতাবাস পরিচালনা করে এখানেই। এসব মানুষের কাছে আপনারা কীভাবে মুখ দেখাবেন? এই মানুষগুলো এখানে লাখ লাখ রুপি ব্যয় করেছে। কারণ, কায়েদ-ই-আজম ঘোষণা দিয়েছিলেন, করাচি হবে যুক্তরাষ্ট্রীয় রাজধানী। তাই লাখ লাখ রুপি তারা ব্যয় করেছে এখানে বাসাবাড়ি নির্মাণ করে। এই মানুষগুলোর ক্ষতিপূরণ আপনারা কীভাবে দেবেন? আমাদেরকে এসবের জন্য ব্যাপক পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হবে, যা পাকিস্তানের রাজস্বের জন্য বিশাল এক ঘাটতি বয়ে আনবে।

ইউসুফ এ. হারুন- তিনি একই যুক্তির পুনরাবৃত্তি করছেন।

শেখ মুজিবুর রহমান- মাননীয় স্পিকার, আমি জানি এটা আপনারা পরিবর্তন করতে পারবেন না। একটা কথা আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আপনি নিজে পূর্ব বাংলা থেকে এসেছেন। আপনি এই হাউজের স্পিকার। আপনি এই হাউজের সকলের সম্পত্তি, কেবল মুসলিম লীগের নেতাদের নয়। তাই আমি আপনার কাছে পূর্ব বাংলার মানুষের অনুভূতির জায়গাটি তুলে ধরলাম। আমি আমার এমন বন্ধুকে জানি যে এখন মন্ত্রী। কিন্তু তাদের দিন ফুরানোর কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। একই ভাগ্যবরণ করতে হবে নুরুল আমিনকে, একই ভাগ্য তাড়া করে ফিরবে মুসলিম লীগকে। সময় আসলেই আপনি তা দেখতে পাবেন। দুঃখের সাথে আজ আমাকে বলতে হচ্ছে, আপনারা পূর্ব বাংলার মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, পাকিস্তানের জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, সিন্ধুর জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। এমনকি সীমান্তে বসবাসরত মানুষদের সাথেও আপনারা বেঈমানী করেছেন। সময়মতো আপনারা এই বেঈমানীর ফল পাবেন এবং তখন সব বুঝতে পারবেন। পূর্ব বাংলায় আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং বাংলাকে একটি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বহাল না করা ব্যতীত এই ওয়ান ইউনিট আইন পাস করলে আপনারা বিপদে পড়বেন। আমি সাবধান করে দিচ্ছি। তাই আমি জাতিকে ঠিক রাখার লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা, মুদ্রা এবং বৈদেশিক চুক্তিবিষয়ক তিনটি খাত কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে রেখে পূর্ব বাংলায় আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার দাবি জানাচ্ছি। এর বেশিকিছু আমাদের বলার নেই। সেইসাথে নাম পরিবর্তনের প্রয়োজন সাপেক্ষে আমরা নিজেদেরকে বাঙালি বলেই পরিচয় দিতে চাই। তাতে সমস্যাই বা কী? কেননা, দিনশেষে আমরা সবাই তো পাকিস্তানি।

অনুবাদঃ ত্বাইরান আবির (লেখক/অনুবাদক/কনটেন্ট রাইটার)

 

© Tayran Abir


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *