যেভাবে বদলে গিয়েছিলেন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন

বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন একসময় মানুষের সমালোচনা করতেন, তরুণ বয়সে। তিনি অন্যায় কাজ কিংবা কারো ভুল সহ্য করতেন না। সরাসরি সমালোচনায় লিপ্ত হতেন। এমন কাজ তিনি নিজের বন্ধুদের সাথেও করতেন। বন্ধুদের কোন ভুল কাজ করতে দেখলে সরাসরি প্রতিবাদ করতেন। কিন্তু একসময় এই স্বভাব থেকে ফিরে আসেন। তিনি বুঝতে পারেন মানুষ ভুল করলেও সরাসরি সমালোচনায় কোন ইতিবাচক ফলাফল আসে না, বরং এতে করে বিদ্বেষ তৈরি হয় সবার মনে। এ ব্যাপারে তার এক বন্ধু তাকে দারুণ বিষয় শিখিয়েছিলো। বন্ধুর কথাবার্তা থেকেই শিক্ষা নিয়ে তিনি নিজেকে পরিবর্তন করতে শুরু করেন।

তর্কবাজ ফ্রাঙ্কলিন একদিন ঠিক একই কাজ করে বসলেন। কোন এক ব্যাপারে বন্ধুদেরকে ভুল প্রমাণিত করতে গিয়ে তর্কে জড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি। আর এসব দেখে তার বন্ধু তাকে সাইডে সরিয়ে নিয়ে গেলো। একপাশে নেয়ার পর তার বন্ধু বললো- ‘বেন, এসব তুমি কী শুরু করেছো? সবার সাথেই তুমি তর্ক করে চলেছো। বন্ধু সার্কেলের এমন কোন লোক নেই যাদের সাথে তুমি তর্ক করোনি। তারা এখন তোমাকে ভালো মনে করে না। এমনকি তোমাকে ব্যতীতই তারা তাদের খেলাধুলা চালিয়ে নেয়ার কথা ভাবে। তুমি দলে উপস্থিত না থাকলেই তাদের আরো ভালো লাগে। তারা জানে যে, তুমি আসলেই নানা ফ্যাসাদ তৈরি হবে। এটা তুমি বুঝতে পারো? পারো না। আমি জানি তুমি সঠিক। কিন্তু সবসময় তর্ক করতে যেও না। অন্যভাবে যদি তাদেরকে বোঝাতে পারো তাহলে বেশ ভালো। এমনভাবে তাদেরকে সব বোঝাতে হবে, যেন তারা নিজেরাই বুঝতে না পারে তুমি তাদের ঔদ্ধত্যকে ধ্বংস করে চলেছো। আর এটা করতে পারলেই তুমি সার্থক। নিজেকে জাহির করা কিংবা স্রেফ অন্যকে ভুল প্রমাণিত করা যদি তোমার উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এখনই তোমার থামা উচিত। কেননা, তোমার বন্ধুত্ব এতে করে সবার সাথে ভালো হবে না, বরং খারাপ হয়ে যাবে।’

নিজের কাছের বন্ধুর এমন কথা শোনার পর বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন এরপর থেকেই নিজেকে বদলে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বন্ধুর বলা কথাগুলোকে তিনি ইতিবাচকভাবে নিয়ে তৎক্ষনাৎ ঐ সময় থেকে নিজেকে পরিবর্তন করতে শুরু করেছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি বলেছিলেন- ‘আমি এরপর থেকে সকলের সাথে তর্ক কিংবা বিরোধ সৃষ্টি না করার বিষয়টিকে আমার জীবনের নিয়ম বানিয়ে নিয়েছিলাম। আমি সবসময়ই চেষ্টা করেছিলাম মানুষের সকল ভালো কাজের প্রশংসা করার জন্য। অনেকটা এমন যে, আমি খারাপ কোন কাজ নিয়ে মাতামাতি করতাম না, পারলে সমাধান করতাম। কিন্তু ভালো কাজ নিয়ে প্রশংসা করা ছিলো আমার নিয়মিত কাজ। এমনকি আমি এরপর থেকে আমার বলা বেশকিছু শব্দও পরিবর্তন করে ফেলেছিলাম। ‘নিশ্চিত’ ‘সন্দেহাতীত’ ‘আমি সঠিক’- এমন শব্দগুলো আমি ব্যবহার করা বাদ দিয়েছিলাম। বিপরীতে ‘আমার ধারণা’ ‘আমার কাছে মনে হয়’ ‘বোধ করি’- এই জাতীয় শব্দগুলো ব্যবহার করা শুরু করেছিলাম। কখনো যদি আমি কাউকে ভুল করতে দেখতাম, তাহলে সরাসরি তাকে এসব নিয়ে কখনোই বলতাম না। তাকে সরাসরি ভুল ধরিয়ে দেয়ার প্রবণতা থেকেও আমি ফিরে এসেছিলাম। আমি জানতাম, মানুষ ভুল করে থাকলেও নিজেকে ডিফেন্স করতে থাকবে। এজন্য আমি যদি কখনো কোনভাবে পারতাম তো সমঝোতা করে মানুষের মাঝ থেকে ভুলকে সরানোর চেষ্টা করতাম। বেশিরভাগ সময়ই আমি নিজের সকল পয়েন্ট মানুষের সামনে তুলে ধরতাম। তারাও নিজেদের পয়েন্ট তুলে ধরতো। আমি তারপর তাদের দৃষ্টিকোণ বোঝার চেষ্টা করতাম। তারা কেন নিজেদের মতো করে কথা বলতো এসব জানার চেষ্টা আমার মাঝে সবসময়ই ছিলো। এক কথায় বলতে গেলে কারো সাথে আমার কোনকিছু নিয়ে চুক্তি করতে গেলে, আমি তার সাথে সেসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতাম। বিস্তারিত আলোচনা করার পর আমাদের জন্য যেটা ভালো হতো, সেটাই আমাদের নিজেদের জন্য বেছে নিতাম। এক কথায়- নিজের জায়গাটি বিনয়ের সাথে সবার সামনে উপস্থাপন করাটাই হয়ে গিয়েছিলো এরপর থেকে আমার আসল কাজ। বাকিরা কী কী কাজ করলো সেসব নিয়ে সমালোচনা করে আমি একদমই সময় নষ্ট করতাম না।’

এই জায়গাটাই যদি আপনি বুঝতে পারেন, তাহলে যাপিত জীবনে অনেক এগিয়ে যেতে পারবেন। পরামর্শ থাকবে- কখনোই কারো সমালোচনায় লিপ্ত হবেন না। তর্ক করবেন না। সরাসরি কাউকে ভুল প্রমাণের চেয়ে এমনভাবে তাকে সঠিক জায়গায় ফিরিয়ে আনুন, যেন তার মনে অহমিকা জাগ্রত হয়ে আপনার প্রতি কোন বিদ্বেষ সৃষ্টি না হয়।

তথ্য সংগ্রহ- অটোবায়োগ্রাফি অব বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন

© Tayran Abir


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *