প্রাপ্য টাকা আদায়ের কৌশলী গল্প

মানুষকে কোন কাজের জন্য রাজি করানো সহজ ব্যাপার নয়। অথবা আপনি যদি চান নিজের কোন স্বার্থ হাসিল করতে, তবুও আপনাকে বেশ কৌশলী হতে হবে। সহসাই মানুষ কোন কাজে রাজি হয় না কিংবা কারো স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কাজে নিজেকে জড়াতে চায় না। তো এক্ষেত্রে একটু সাবধানে কাজ করুন। ধরা যাক, কোন কাজে আপনার ভুল হলো কিংবা আপনি এমন একজন মানুষের আন্ডারে কাজ করছেন, যার স্বভাবই হচ্ছে খুঁত ধরা। এমতাবস্থায় আপনার নিজের প্রাপ্য কীভাবে তুলে নেবেন? বলতে গেলে এটা বেশ জটিল কাজ। এ বিষয়ে ফার্দিনান্দ ই ওয়ারেনের গল্প জানা যাক। একবার তিনিও পড়েছিলেন একই বিপদে। তারপর কী হলো? চলুন দেখে নেই-

ফার্দিনান্দ ই ওয়ারেন ছিলেন একজন কর্মাশিয়াল আর্টিস্ট। একবার এক বদমেজাজী ক্রেতাকে কৌশল প্রয়োগ করে তিনি নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, তিনি বলেছিলেন- “নামী মানুষদের ছবি আঁকতে গেলে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হয়। কিছু শিল্প সম্পাদক রয়েছে, তাদের কাজ খুব দ্রুত করতে হবে। চোখের পলক ফেলার আগে সেই কাজ করে দিতে হবে। এতো তাড়াতাড়ি কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় ভুল হয়ে যায়। আমি এমন একজন শিল্প সম্পাদককে জানতাম, তিনি ছোটোখাটো ভুল ধরে অনেক আনন্দ পেতেন। আমি প্রায়ই তাঁর অফিস থেকে ভীষণ রেগে বেরিয়ে আসতাম। সেটা অবশ্য তাঁর সমালোচনার জন্যে নয়। কাজ খারাপ হলে তা তো সমালোচিত হবে। তার জন্যে আমি আগে থেকে নিজেকে প্রস্তুত রাখতাম। কিন্তু তিনি যেভাবে আমাকে ব্যক্তি আক্রমণ করতেন, সেটি আমার কাছে ভালো লাগতো না। সম্প্রতি ঐ ভদ্রলোককে আমি কিছু কাজ করে দিয়েছিলাম, তিনি আমাকে টেলিফোন করে তার অফিসে যেতে বললেন। তিনি জানালেন আমার কাজে কিছু ভুল হয়েছে। তিনি এমনকি আমাকে বেশকিছু ভুল সম্পর্কে বললেন। আমি এতদিন ধরে সযত্নে যা শিখেছিলাম, সব যেন ভুলে গেলাম। আমার পায়ের তলার মাটি কেঁপে উঠলো। আমি বললাম- “আপনার সব কথা মেনে নিচ্ছি। আমার এই অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই। বহুকাল ধরেই আমি আপনার ছবি আঁকছি। সুতরাং আপনার চাহিদা কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে আরো বেশি সতর্ক হওয়া উচিত ছিল আমার। যাহোক, যা হয়েছে সেসবের জন্য আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি। আমি সত্যি আন্তরিকভাবে নিজের ভুলের জন্য নিজেকেই দোষারোপ করছি।”

আমার এই কথা শোনার পর ভদ্রলোকের চেহারা বদলে গেলো। আমি আসার পর তার মাঝে নিজেকে নিয়ে গর্ব করার মতো একটি ভাবসাব দেখেছিলাম, সেটা সাথে সাথে উবে গেলো। বাষ্পের মতো যেন নেই হয়ে গেলো তার গৌরব। অতঃপর তিনি আমার পক্ষ নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। আগের সেই রাগী ভাবটা তার মাঝে আমি আর খুঁজে পেলাম না। তো আমাকে তিনি বললেন – “হ্যা, আপনি ঠিকই বলেছেন। তবে এই ভুলটা এমন কিছু বেশি নয়। একটু সতর্ক হলেই এটাকে ফেরানো যেতো।”

আমি তাকে বাঁধা দিলাম। বললাম- “যেকোন ভুল ই অনুচিত। ছোট বড় কোন ব্যাপার নয়, ভুল মানে ভুল। হোক সেটা ছোট কিংবা বড়। ভুল করলেই খরচ বৃদ্ধি পাবে, সময় নষ্ট হবে। ক্লায়েন্টরা খুশী হবে না। এমনটা কি হওয়া উচিত? একদমই না। তাই আমি এসবের দায় নিজের ওপর তুলে নিচ্ছি।” আমার কথা শোনার পর সম্পাদক এবার আমাকে নিজের ঘাড়ে দোষ না নেয়ার জন্য বাঁধা দিলেন। তাও আমি নিজের কাজ নিয়ে নিজেই সমালোচনা করলাম। আমার ছোট্ট ভুলটিকেও গুরুত্ব সহকারে নিয়ে আমি তার সাথে কথা বললাম। আমি সম্পাদককে বুঝিয়ে দিলাম যে, আমি তার কাজের বিষয়ে কতটা সিরিয়াস! এরপর আমি তাকে আশ্বাস দিলাম পরবর্তীতে আরো যত্নের সাথে কাজ করার ব্যাপারে এবং আমি আর কখনোই এই ছোটখাটো ভুল করবো না এসবও তাকে জানিয়ে দিলাম। এমনকি আমি বললাম প্রয়োজনে যেসব ভুল হয়েছে সেসব শুধরে নিয়ে ছবিটি ফের আমি আঁকবো। আমার সিরিয়াসনেস দেখে ও কিঞ্চিৎ একটা ভুল নিয়ে এমন অকুন্ঠ স্বীকারোক্তি দেখে ভদ্রলোক অবাক হয়ে গেলেন। তিনি বললেন- “না না, এই কাজ আপনাকে আর নতুনভাবে করতে হবে না। কাজটা সবদিক দিয়েই ভালো হয়েছে। একআধটু এমন ভুল সবারই হয়ে থাকে। সামান্য একটু অদল-বদল করলেই আমাদের ক্লায়েন্টরা নিয়ে নেবে। আমার ভুলে তাঁর কোনো অর্থ ক্ষতি হয়নি। এতে চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমি আপনার কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট।” এরপর সেই সম্পাদক আমাকে মধ্যাহ্নভোজে ডেকে নিয়ে গেলেন। আমি বিদায় নেবার আগে আমাকে একটা চেক দিলেন। কমিশনের টাকাটাও আমার হাতে তুলে দিলেন। তো আমি আমার ভুল স্বীকার করার মাধ্যমে এটা করতে পেরেছিলাম। যদিও একদম ক্ষুদ্র একটি ভুল ছিলো, তথাপি আমি এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেছিলাম, যা দেখার পর সম্পাদকের মনে হয়েছিলো আমি তার কাজের প্রতি ব্যাপক সিরিয়াস, তার কাজকে আমি অনেক গুরুত্ব সহকারে করে থাকি। তিনি নিজের সেই উপলব্ধি থেকেই আমাকে নিজের প্রাপ্য বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।”

ফার্দিনান্দ ঠিক এভাবেই নিজের কৌশল ব্যবহার করে ক্লায়েন্টের মন জয় করে নিয়েছিলো। আপনারা এসব ক্ষেত্রে কী করেন? মন্তব্যের ঘরে জানাতে পারেন।

প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ- ডেল কার্ণেগী মোটিভেশনাল বুকস

© Tayran Abir


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *