ডেল কার্ণেগী ও তার কুকুর রেক্সের গল্প

আমি নিউইয়র্কের প্রায় মাঝামাঝি অঞ্চলে থাকি। যেখানে আমি থাকি, সেই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিমোহিত হবার মতই। আমার নিজের কাছেই বেশ ভালো লাগে। আমার বাড়ির থেকে মাত্র এক মিনিটের দূরত্বে চমৎকার একটি বনভূমি আছে। দেখলেই চোখ জুড়াবে এমন। বসন্তকালে সেখানে প্রকৃতি অপরূপা হয়ে ওঠে। জাম গাছে জাম ধরে। কাঠবিড়ালিরা এখানে সেখানে বাসা বেঁধে বাচ্চাদের নিয়ে খেলা করে। আমার ঘোরাফেরার বাতিক রয়েছে। সময় পেলেই আমি ঘুরতে বেরোই। বিশেষ করে বনজঙ্গলে ঘোরাঘুরি করতে আমার মনে আকর্ষণ কাজ করে। প্রত্যেকে মানুষের মনেই একেক জায়গা নিয়ে আকর্ষণ কাজ করে থাকে, আমার ক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে বনজঙ্গল। তাই মাঝেমধ্যেই আমি বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ি। অবসর পেলেই বাড়ির কাছের ঐ বনভূমিতে বেড়াতে যাই। আমার সঙ্গী হিসেবে থাকে আমার কুকুর রেক্স। রেক্স খুব নিরীহ একটা কুকুর। তাই তাকে আমি শেকলে বেঁধে নিয়ে যাই না। কেননা, ঐ পার্কে কারো সাথে দেখা হবার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। বিশেষ করে আমি যখন পার্কে যাই, তখন মানুষের আনাগোনা কম থাকে। কিছু কিছু সময় থাকে, যখন পার্কে মানুষের আনাগোনা অনেক বেশি থাকে। আবার কিছু কিছু সময় তেমন লোক থাকে না। তো এই কারণে বেশি মানুষের সাথে দেখা হওয়া সম্ভাবনা যেমন নেই, তেমনিভাবে রেক্সের দ্বারাও কারো ক্ষতি হওয়ার কোন সম্ভাবনা আমি দেখি না। আমার পুরোপুরি ভরসা ছিলো রেক্স অন্তত আর যাইহোক কোনরকম ক্ষতিকর কাজ করবে না। পার্কে কুকুর নিয়ে বেড়াতে যাওয়ার পেছনে এটাই অন্যতম কারণ। আমি যদি দেখতাম রেক্স ভয়ানক আচরণ করে, তাহলে নিশ্চয়ই কুকুর সাথে নিয়ে যেতাম না। মূলত নিরীহ স্বভাবের ফলেই রেক্স আমার সাথী হতে পেরেছিলো। তাই নিয়মিতই আমি রেক্সকে নিয়ে পার্কের ভেতরে ঢুকতাম।

কিন্তু একদিন আমার কপাল খারাপ। পার্কে দেখা হয়ে গেলো এক পুলিশের সঙ্গে। পুলিশ ভদ্রলোক সঙ্গে সঙ্গে তার ক্ষমতা দেখানোর জন্য তৎপর হয়ে উঠলেন। তিনি আমাকে ধমকে উঠে বললেন- “এসব কি হচ্ছে! পার্কে কুকুর এলো কীভাবে? আপনি এভাবে একটি শেকল ছাড়া কুকুর নিয়ে পার্কে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কেন!? আপনি কি জানেন, আপনি একটা বেআইনি কাজ করেছেন?” পুলিশের কথার জবাবে আমি চুপ করে রইলাম। তারপর বিনয়ের সাথে বললাম- “হ্যা, তা জানি। কিন্তু আমার কুকুর কারো ক্ষতি করবে না। তাছাড়া এটা এখনো কারো ক্ষতি করেনি। আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি রেক্সের দ্বারা কোন মানুষের ক্ষতি হবে না। ক্ষতি হওয়ার কোন সম্ভাবনা থাকলে আমি আমার কুকুর নিয়ে পার্কে আসতাম না।”

পুলিশ ভদ্রলোক মনে হয় আমার কথায় আরো রেগে গেলেন। একে তো আমি আইন ভঙ্গ করেছি, তার ওপর নিজের কুকুর নিয়ে পার্কে আসার পেছনে যৌক্তিকতা প্রদর্শন করছি। সত্যি বলতে, পার্কে তো শেকলে না বেঁধে কুকুর নিয়ে আসাটাই অনুমতিপ্রাপ্ত ছিলো না, সেখানে আমার কুকুর আনার পেছনে যুক্তি দেয়াটাই ছিলো ভুল। তো পুলিশ সদস্যটি এজন্য আমাকে বললেন- “আপনি কি বলছেন তা আপনি নিজে জানেন? আপনার কুকুর মানুষের ক্ষতি করতে পারবে নাকি পারবে না- এসব নিয়ে আইনের কিচ্ছু যায় আসে না। আইন তার নিজের মতো করে চলবে। কুকুর নিয়ে পার্কে প্রবেশ করা নিষিদ্ধ এটাই হচ্ছে আসল কথা। এখন আপনার কুকুর ক্ষতিকর নয়, এমন যুক্তি দিয়ে আইন ভঙ্গ করার অধিকার রাখেন না আপনি। বড় মানুষের ক্ষতি না করলেও কুকুরটা হঠাৎ কোনো কাঠবিড়ালি মেরে ফেলতে পারে। কোন বাচ্চা ছেলেকে কামড়াতে পারে। সে যাইহোক, আপনাকে দেখে আমার ভদ্রলোকই মনে হচ্ছে। নিশ্চয়ই কোন সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য আপনি। তাই এবারের মতো আপনাকে ছেড়ে দিলাম। ভবিষ্যতে আপনি কুকুর নিয়ে আসবেন না। আর যদি আসেন, সেক্ষেত্রে শেকলে বেঁধে নিয়ে আসবেন। যদি আপনার কুকুরকে শেকলে না বেঁধে এখানে নিয়ে আসনে তাহলে কিন্তু আপনাকে ঝামেলায় পড়তে হবে। এমনকি আদালতের জজ সাহেবের কাছে গিয়ে জবাবদিহি করতে হবে।” পুলিশ ভদ্রলোকের কথা শুনে আমি নিজের ভুল বুঝতে পারলাম। আমি স্পষ্তই ধরতে পারলাম আমার আসলে কোথায় দোষ ছিলো। তাই আমি তাকে বিনয়ের সাথে বললাম- “আসলে আমি ভুল করেছি। আমার এমন করা উচিত হয়নি। তবে এবারের মতো আমাকে মাফ করে দিন। পরবর্তীতে আমি কখনো আইন ভঙ্গ করবো না।”

আমার কথা শোনার পর পুলিশ ভদ্রলোক আমাকে ছেড়ে দিলেন। আর আমিও আমার কথা রেখেছিলাম। এরপর থেকে যখনই ঐ পার্কে বেড়াতে যেতাম, রেক্সের গলায় শেকল পরিয়ে দিতাম আমি।বোধ করি এটা রেক্সের কাছে ভালো লাগতো না। সে মুক্তভাবে বিচরণ করতে চাইতো। নিজের গলায় শেকল ঝোলাতে দেখলেই কেমন গরগর করে উঠতো রেক্স। এভাবেই নিজের অপছন্দের বিষয়টি জানান দিতো সে। কিন্তু আমি ছিলাম নিরূপায়। আমার তো আইন ভঙ্গ করা চলবে না। তাই আমি রেক্সের গলায় শেকল পরিয়ে দিতাম এবং রেক্স শেষ পর্যন্ত আমাকে শান্তভাবে অনুসরণ করতো। এভাবেই কেটে গেলো কয়েকটা দিন। ফের আমি আবার রেক্সকে শেকল খুলে পার্কে নিতে শুরু করলাম। আমরা তখন পাহাড়ের দিকে ঘুরতে যেতাম। ঐদিকটা উঁচু হওয়ার ফলে মানুষের আনাগোনা কম ছিলো এবং পুলিশের সাথেও দেখা হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো না বলতে গেলে। কিন্তু বিধি বাম। একদিন আমি আর রেক্স আবার ফাঁদে পড়ে গেলাম। প্রতিদিনের মতই বিকেলবেলায় আমরা যখন পাহাড়ের পাশ দিয়ে ঘুরছিলাম, পাহাড়ের কোলে ঐ একই পুলিশের সামনে পড়ে গেলাম আমরা। তিনি ঘোড়ার পিঠে ছিলেন। রেক্স খোলা অবস্থায় সোজা তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আমি রীতিমতো চিন্তায় পড়ে গেলাম। এবার বোধহয় আর রক্ষা নেই। শেষ পর্যন্ত জল মনে হয় আদালত পর্যন্ত গড়াবে- এমনটাই ভাবছিলাম আমি। তাই বিপদ থেকে বাঁচতে পুলিশকে আর কথা বলার সুযোগ দিলাম না। আগ বাড়িয়ে কুশল জিজ্ঞেস করে আমি নিজেই নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করে জবাবদিহি করতে শুরু করলাম। বললাম- “অফিসার, এর আগে আপনি আমাকে সাবধান করেছিলেন। আইনী জটিলতার কথাও জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেসব পেরিয়েও আমি নিজের কুকুর নিয়ে আবার পার্কে এসেছি। আজকে আপনি আমাকে আবার ধরেছেন। আমি দোষ করেছি। আমার কোনো অজুহাত নেই। আপনি বলেছিলেন পরবর্তীতে আমি আইন ভঙ্গ করলে, আমার বিরুদ্ধে আপনি আইনগত ব্যবস্থা নেবেন। আমি আপনার নিকট নিজেকে সারেন্ডার করলাম। আপনি আপনার যেমন ব্যবস্থা নেয়া দরকার, নিতে পারেন। আমি একটুও আপত্তি করবো না।” আমার কথা শুনে পুলিশ ভদ্রলোক হঠাৎ নরম হয়ে গেলেন। তার ঔদ্ধত্য কোথায় যেন হারিয়ে গেলো। আমি ধরে নিয়েছিলাম আমার বিরুদ্ধে তিনি ব্যবস্থা নেবেন, আমাকে কোর্টে যাওয়ার জন্য বলবেন। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি বললেন- “ঠিক আছে। আপনি আপনার নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন, এটাই অনেক বড় ব্যাপার। আমি বুঝতে পারছি, এই ছোট্ট নরম তুলতুলে কুকুরটিকে শেকল বেঁধে রাখলে মন খারাপ হয়ে যায়। মুক্তভাবে হাঁটাচলা করার মজাই আলাদা। এই কুকুরটিও হয়তো তা বুঝতে পারে। যখন আশেপাশে কেউ থাকে না, তখন হয়তো মুক্তভাবে চলার ইচ্ছে হয়, তাই না?”

পুলিশ সদস্যটির কথা শুনে আমি বুঝতে পারলাম, ভদ্রলোক আমার প্রতি একটু সহানুভূতিশীল হতে চলেছেন। এই সময়ে তার কাছ থেকে সুুবিধা নেয়া সম্ভব। আমি তাই বিনয়াবত হয়ে বললাম- “হ্যা, আপনি ঠিকই ধরেছেন। আপনি বিচক্ষণ মানুষ। মুক্তভাবে কুকুর নিয়ে হাঁটাচলাটা বেশ আনন্দ দেয়। বেচারা কুকুরও নিজেকে মুক্ত রাখতে চায়। তাই আমি শেকল না বেঁধে এটাকে নিয়ে এসেছি, আইনের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও। একজন সৎ নাগরিক হিসেবে আমার উচিত ছিল আইন মেনে চলা এবং কুকুরটিকে শেকল বেঁধে নিয়ে আসা, বাকিদের নিরাপত্তার স্বার্থে।” পুলিশটি তখন বললো– “হুম। ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছি আমি। ইটস ওকে। আমরা কাছে মনে হয়, এই কুকুর কারো ক্ষতি করবে না। কেননা এটা আপনার পালিত কুকুর। মালিককে অনুসরণ করাই হচ্ছে এর কাজ। আপনার ভ্রমণসঙ্গী হয়ে ঘুরে বেড়াতে পারে যে কুকুর, সেটা অন্তত মানুষের ওপর ঝাপিয়ে পড়ার মতো ভুল করবে না বলেই মনে হচ্ছে।” এই কথার বিপরীতে আমি বললাম- “না স্যার, আপনি বুঝতে পারছেন না। কুকুর বলে কথা। এটা তো আর মানুষ নয়। মানুষের মতো বুদ্ধি নেই। সামনে একটা ছোট্ট কাঠবিড়ালিকে দেখলে থাবা দিয়ে সেটাকে মেরে ফেলতে পারে। তাছাড়া কখন হুট করে কার ক্ষতি করে ফেলে। আমি নিশ্চিত করে বলছি না যে, এটা কারো জন্য ভয়ানক হয়ে উঠবে। বরং আমার কাছে মনে হয়, এটা কারো ক্ষতি করবে না। তারপরও যদি করে ফেলে, আমি কেবল সেই শঙ্কা প্রকাশ করছি। সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যায় না।” পুলিশ ভদ্রলোক এবার বললেন- “বুঝেছি, আপনি ব্যাপারটাকে বেশি সিরিয়াসলি নিয়ে নিচ্ছেন। আপনার কথাও সঠিক, আবার কুকুরটিরও মুক্ত হয়ে বেড়ানো চাই। উভয় সংকট। ঠিক আছে, এটাকে পাহাড়ের ধারে ছুটোছুটি করতে দিন। আপনি পাহাড়ের দিকটায় ঘোরাঘুরি করতে পারেন। এতে করে আপনার কুকুরের দ্বারা যেকোন প্রকার ক্ষতির সম্ভাবনা একেবারেই কমে যাবে। তাছাড়া আমার সাথেও খুব একটা দেখা হবে না। তাহলেই সব ঝামেলা শেষ।” এভাবেই পুলিশের অনুমোদন পেয়ে গিয়েছিলাম আমি। এরপর থেকে সবসময়ই পার্কে ঘুরে বেড়াতাম শেকলবিহীন কুকুরটিকে। আমি যদি নিজের ভুল স্বীকার না করতাম এবং গোয়ার্তুমি করতাম, তাহলে কখনোই পুলিশের হাত থেকে রক্ষা পেতাম না।

সারকথা- বিনয়ের সাথে নিজের ভুল স্বীকার করুন।

জরুরী তথ্য সংগ্রহ- ডেল কার্ণেগী বুকস

© Tayran Abir


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *