অহমিকা ধ্বংস করে দেয় আপনার সম্পর্ক

অহমিকা নাকি ভুল করলে তা স্বীকার করা উচিত? এমন প্রশ্ন যদি আপনাদেরকে করা হয়, তাহলে বেশিরভাগ মানুষই নিশ্চিতভাবে উত্তর দেবেন- ভুল থাকলে স্বীকার করা উচিত। কিন্তু বাস্তব জীবনে এমনটা হয় না। আমরা অনেকেই ভুল স্বীকার করতে রাজি না, ভুল স্বীকার করতে চাই না। নিজের অহমিকা বজায় রেখে ভুলের ওপর অটল থাকবে মানুষ, তাও ভুল স্বীকার করবে না, সচরাচর এটাই হয়ে থাকে। কিন্তু এসবের ফলে কী হয়? সম্পর্কগুলো নষ্ট হয়ে যায়। ব্যক্তিগত গন্ডি থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক গন্ডি সকল ক্ষেত্রেই সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ফলাফল ভালো কিছু বয়ে আনে না। সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার কারণে জীবন তিক্ততায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতিও নষ্ট হয়ে যায়। এ ব্যাপারে একটি ঘটনা আমি আপনাদের সৌজন্যে উল্লেখ করছি। বোধ করি আপনারা ঘটনাটি থেকে শিক্ষা নিতে পারবেন।

সারাবিশ্বের বিভিন্ন দেশেই ডেল কার্নেগী ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। এসব ফাউন্ডেশন কতৃক বিভিন্ন কোর্স পরিচালনা করা হয়ে থাকে স্কিল ডেভেলপমেন্টের ওপর। এই কোর্সেরই হংকং শাখার দায়িত্ব ছিলো যার ওপর, তার নাম মাইকেল চং। মূলত তিনিই ঘটনাটি শেয়ার করেছিলেন। একবার তার ক্লাসে একজন মধ্যবয়স্ক বাবার দেখা পেয়েছিলেন তিনি। ঐ বাবা বহু বছর ধরে তার ছেলের কাছ থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিলেন। তিনি আফিম খেতেন। আফিম আসক্তি তার মাঝে প্রচুর পরিমাণে ছিলো। এজন্য তার ছেলে তাকে ঘৃণা করতো। ছেলে এসব পছন্দ করতো না। কিন্তু ঐ ব্যক্তি এসব ছাড়তে পারেননি বলেই ছেলের সাথে তার সম্পর্কের দুরত্ব সৃষ্টি হয়েছিলো। তবে ভালো খবর হচ্ছে, পরবর্তী সময়ে তিনি তার আফিম আসক্তি কাটিয়ে ফেলেছিলেন। নিজের ছেলের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা ও নাতি নাতনীদের সাথে দেখা করার প্রচন্ড আকাঙ্ক্ষা সেই বাবার মাঝে কাজ করতো। কিন্তু চীনা সমাজে একটা সংস্কার প্রচলিত রয়েছে। বড়রা কখনোই নিজের দোষ স্বীকার করে আগ বাড়িয়ে ছোটদের সামনে গিয়ে উপস্থিত হয় না। এটা চীনা সংস্কৃতির সাথে যায় না। মূলত বড়রা এসব ক্ষেত্রে বেশ লজ্জিত বোধ করে থাকেন। তো সেই বাবার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটেছিলো। তিনি আফিম আসক্ত ছিলেন, ছেলে তাকে পছন্দ করতো না, তারা বিচ্ছিন্ন ছিলো, এসব পুরোপুরি সত্য। কিন্তু বাবা আগ বাড়িয়ে তার ছেলের কাছে যেতে পারছিলেন না। আবার ছেলের সাথে দেখা করা, ঘরের নাতি-নাতনীদের দেখার আকাঙ্ক্ষাও তিনি ছাড়তে পারছিলেন না। প্রায়ই দেখা যেতো ক্লাসে আসার পর বাকি স্টুডেন্টদের সাথে তিনি এসব নিয়ে আলাপ করতেন। তার সহপাঠীরা সবাই এসব মগ্ন হয়ে শুনতো এবং তাকে ছেলের সাথে দেখা করার জন্য উৎসাহ দিতো। কিন্তু ঐযে সংস্কৃতি! সংস্কারের দৃষ্টিভঙ্গিকে এড়িয়ে গিয়ে তিনি ছেলের সাথে দেখা করতে যেতে পারছিলেন না। তাই অপেক্ষা করা ব্যতীত তার হাতে আর কোন অপশন বাকি ছিলো না। কেননা, পুনরায় বাবা ও ছেলের মিলিত হওয়ার ক্ষেত্রে সবকিছুই ছেলের ওপর নির্ভর ছিলো। এসব মিলিয়ে সেই বাবা উভয় সংকটে পড়ে গিয়েছিলেন।

তারপর একদিন নিজের শেষদিকের ক্লাসে বক্তৃতা রাখছিলেন। সেখানে তিনি তার ও নিজের ছেলের মধ্যকার সম্পর্কের জটিলতার বিষয়টি আবারও সামনে নিয়ে আসেন। তিনি বলেছিলেন- ‘আমি আমার ও আমার ছেলের সম্পর্ক বিচ্ছিন্নতার বিষয়টি নিয়ে অনেক ভেবেছি। এসব নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে করতে আমার বহু দিন ও রাত কেটে গিয়েছে। ভেবেচিন্তে আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। ডেল কার্নেগী আমাদেরকে বলেছিলেন- ‘আপনি যদি কখনো ভুল করে থাকেন, তাহলে নিজ দায়িত্বে মানুষের কাছে এটা স্বীকার করুন’। কার্নেগীর এই কথা আমার মনকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে আমার নিজেরই ভুল হয়েছে। ছেলের কাছে আমার নিজেরই যাওয়া উচিত। আমি আফিমে আসক্ত ছিলাম একসময়। বাবার প্রতি এখান থেকে রাগ হয়ে কোন ছেলের চলে যাওয়াটা তাই স্বাভাবিক। আমার ছেলে ঠিক এই কাজটিই করেছে। সে তার খারাপ লাগাকে নিয়ে সরে গেছে, চলে গেছে আমার কাছ থেকে দূরে। কিন্তু সে নিজে তো কোন খারাপ কাজ করেনি। আমিই বরং নিজেকে এভাবে সরিয়ে রেখে খারাপ কাজ করেছি। আমি তার কাছে যাবো। আমি এখন পর্যন্ত তার কাছে যাইনি। তবে যাওয়ার সময় শেষ হয়ে যায়নি। আমি তার কাছে গিয়ে নিজের ভুল স্বীকার করবো। তাকে সব বুঝিয়ে বলবো।’ সেই বাবার এই কথা শোনার পর তার সহপাঠীরা সবাই সাধুবাদ জানিয়েছিলো এবং তাকে ফের উৎসাহিত করেছিলো ছেলের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য। অতঃপর ঐ বাবা নিজের ছেলের কাছে গিয়েছিলেন, নিজের সকল ভুল স্বীকার করে ছেলের সাথে সম্পর্ককে পুনরায় ঠিক করেছিলেন। ছেলের বউ ও নাতি-নাতনীদেরকে সাথে নিয়ে পরবর্তী সময়টা তার ভালোই কেটেছিলো।

এই ঘটনা থেকে আশা করি আপনারা অনেক কিছুই বুঝতে পেরেছেন। তাই সবার প্রতি পরামর্শ থাকবে- কখনো যদি কোন ভুল করে থাকেন, তাহলে বিনয়ের সাথে স্বীকার করুন। এতে করে সম্পর্ক ভালো থাকবে, আপনিও একটি সুন্দর জীবন কাটাতে সক্ষম হবেন।

তথ্যসূত্র- ডেল কার্নেগী ফাউন্ডেশন

© Tayran Abir


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *