অভিযুক্ত মায়ের ভুল সংশোধনের গল্প

বারবারা উইলসনের একমাত্র কন্যা হচ্ছে লরি। কিন্তু লরির সাথে তার মায়ের সম্পর্ক ভালো ছিলো না। ক্রমশই তা আরো খারাপের দিকে যাচ্ছিলো। একজন মা হিসেবে মিসেস উইলসন নিজের দায়িত্ব পালন করতে পুরোপুরিই ব্যর্থ হয়েছিলেন। তিনি কেবল লরির বিভিন্ন কর্মকান্ড নিয়ে একের পর অভিযোগ করতেন। লরি স্বভাবে ছিলো বেশ চুপচাপ, নম্রভদ্র মেয়ে। নীরবতাই ছিলো তার সঙ্গী। এর পেছনে কারণ হতে পারে মায়ের কাছ থেকে ভালোবাসা না পাওয়া কিংবা পারিবারিক কোন সাপোর্ট না থাকা। লরিকে তার মা প্রচন্ড শাসন করতো, হুমকি দিতো এবং তাকে মারধোর করতো। অথচ এসব করার পেছনে উল্লেখযোগ্য কোন কারণ থাকতো না। আপনি যদি আপনার আশেপাশে তাকান, তাহলে এমন অনেক মা’কে দেখতে পাবেন, যারা তার সন্তানদেরকে ঠিকমতো বুঝতে চায় না, কিন্তু শাসনের বেলায় কয়েকধাপ এগিয়ে থাকে। নিজের সন্তানকে মারধোরও করে থাকে না বুঝে অনেকে। বারবারা উইলসন ছিলেন এমনই একজন মা। তিনি যে এই কাজের মাধ্যমে ভুল করতেন, সেটা হয়তো বুঝতেন না। ভুল বুঝেই লরিকে শাসন করতেন। একবার আমাদের ক্লাসে আসলেন মিসেস উইলসন। তিনি আমাদের ক্লাসের সবার উদ্দেশ্যে বললেন। ‘আমি সকল ধরণের হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। লরি আমার কোন কথাই শুনতো না। একদিন সে তার বান্ধবীর সাথে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেলো সাজগোজ করে। সেদিনও আমি তাকে আটকে রাখতে পারলাম না। তারপর যখন সে বাড়ি ফিরলো, আমি তাকে ইচ্ছেমতো ঝাড়ি দিলাম। আমার সকল রাগ তার ওপর ঝাড়লাম। এতটাই রাগান্বিত হলাম আমি যে, আমি আর নিতে পারছিলাম না। আমি কেবল তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম এবং বারবার জিজ্ঞেস করছিলাম- ‘কেন লরি, কেন!? কেন তুমি আমার কথা শোনো না!’

আমার কথা শোনার পর সে চুপচাপ রইলো। তবে আমার মনের অবস্থা মনে হয় সে বুঝতে পারলো। নরম স্বরে তাই সে বললো- ‘সত্যিই তুমি শুনতে চাও?’ জবাবে আমি মাথা ঝাঁকালাম। এরপর লরি তার মনে জমে থাকা সকল কথা বলতে শুরু করলো। শুরুতে সে সুন্দরভাবেই কথা বলছিলো। তারপর নিজের ভেতর থেকে ধোঁয়ার ন্যায় বের হতে লাগলো তার সকল অভিমান। অন্তত আমার কাছে এটাই মনে হচ্ছিলো। আমি লরির কথা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। লরি একটানা কথা বলে গেলো- ‘তুমি আমার কথা কখনোই শোনোনি। কখনোই তুমি আমাকে বুঝতে চাওনি। আমি কী চাই, আমি কী করি, আমি কোন কাজে আগ্রহী, কীভাবে নিজের জীবনকে সাজাতে চাই- এসব নিয়ে কিছুই তুমি শোনোনি। আমাকে কখনোই তুমি পরামর্শও দাওনি। কেবল শাসন করে গিয়েছো।’ এসব শোনার পর আমার আর কী বলার থাকতে পারে? কিছুই না। আমি থ মেরে গিয়েছিলাম। বারবার কানে ভাসছিলো লরির কথাগুলো। ঐ দিনের পর থেকেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম লরির আসলে আমাকে চাই, লরি আমাকেই সবচাইতে আপন মনে করে। গতানুগতিক কোন কড়া শাসনকারী মা হিসেবে নয়, লরি সবসময়ই আমাকে একজন বন্ধু হিসেবে পাশে চেয়েছিলো। তার পাশে একজন পরামর্শক হিসেবে চেয়েছিলো। লরি আমাকে এমন একজন মা হিসেবে পেতে চেয়েছিলো, যেই মা তার সন্তানকে চলার পথে সকল ধরণের নির্দেশনা দিয়ে থাকে। ঐ সময়ের পর থেকেই আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছিলাম। পরবর্তীতে আমি নিজেকে শুধরে ফেলি। লরির আদর্শ মা হওয়ার পথে যেসব বাঁধা আমি নিজের মাঝে গড়ে নিয়েছিলাম, সেসব একটা সময় আমি নিজেই ধ্বংস করে ফেলেছিলাম। এরপর থেকে লরি যা বলতো, যা বোঝাতে চাইতো, সেসব মনোযোগ সহকারে আমি শুনতাম। তারপর তাকে পরামর্শ দিতাম। এভাবেই আমাদের টানাপোড়েনের সম্পর্ক একসময় অনেক ভালো হয়ে গিয়েছিলো। আমি যেমন লরিকে সাহায্য করতাম, লরি নিজেও আমার জন্য একজন সাহায্যপরায়ণ কন্যা হয়ে উঠেছিলো।’

সারকথা- আপনার আশেপাশের মানুষগুলোর কথা মনোযোগ সহকারে শুনুন। তাদেরকে বুঝতে চেষ্টা করুন।

তথ্য সংগ্রহ- ডেল কার্নেগী এ্যাসোসিয়েশন

© Tayran Abir


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *