বাকস্বাধীনতা মানেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব

৩রা ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৬ সাল। পাকিস্তানের সংসদে সাংবিধানিক অধিবেশনে বাকস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বঙ্গবন্ধু জোরালো বক্তব্য দিয়েছিলেন।

শেখ মুজিবুর রহমানঃ মাননীয় স্পিকার, আমি সংসদের একজন সদস্য হিসেবে মিস্টার মাহমুদ আলীর আনীত সংশোধনীর সাথে একমত পোষণ করছি। এ ব্যাপারে আমি আমার বক্তব্যকে দীর্ঘায়িত করব না। কেননা, বাকস্বাধীনতার ব্যাপারে আমার পূর্বে আমার সংসদীয় বন্ধু স্পষ্ট বলে গিয়েছেন, সংবিধানে উল্লেখিত বাকস্বাধীনতা দেশের গণমাধ্যমগুলোর স্বাধীনতা রক্ষা করছে না। গণমাধ্যমগুলো স্বাধীনভাবে কিছু করতে পারছে না এবং এগুলোর স্বাধীনতার ব্যাপারে সংবিধানে স্পষ্টভাবে কিছু উল্লেখ করা নেই। কারণ, সরকার তাদেরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে। মাননীয় স্পিকার, উপস্থিত আমরা সবাই এই পবিত্র সংসদের সদস্য। কিন্তু আপনি জেনে অবাক হবেন যে, এমনকি আমাদের চিঠিগুলো পর্যন্ত সেন্সর করা হয়। এটা হয়ত আপনি জানেন না, কিন্তু উপস্থিত সাংসদদের অনেকেই জানেন। করাচিতে আমাদের আত্মীয়স্বজন কিংবা স্ত্রীর নিকট থেকে আসা প্রতিটি চিঠিপত্র সেন্সর করা হয়, ফোনকলগুলো চেক করা হয়, যদিও আমরা এই মহামান্য সংসদেরই সদস্য। মহামান্য মন্ত্রীগণও এসব অস্বীকার করতে পারবেন না। আমি তা স্পষ্ট প্রমাণ করতে পারি। কিন্তু যখনই এসব নিয়ে আমি কথা বলেছি, তখনই তারা কঠোর হস্তে আমাদের দাবি দমন করেছে।

আই আই চুন্দ্রিগরঃ জনাব, যদি সম্মানিত সাংসদগণ এ ব্যাপারে পূর্বে নিশ্চিত না হয়ে থাকে, তাহলে তাদের নিশ্চয়ই উচিত নয় সংসদে এ বিষয়ে কোন মন্তব্য পেশ করা।

শেখ মুজিবুর রহমানঃ মিস্টার চুন্দ্রিগর, আমি নিজে এসব ভোগান্তি সয়েছি। আমাদের চিঠিপত্রগুলোর ওপর পর্যন্ত সেন্সরশিপ জারী করা হয়েছে। আপনি এসব অস্বীকার করতে পারবেন? সংসদে উপস্থিত মন্ত্রীগণ এসব অস্বীকার করতে সক্ষম? আমাদের ফোনকল বারবার চেক করা হয়। আপনি বলেছেন, বাকস্বাধীনতা মানেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। কিন্তু আপনি কি কখনো দেখেছেন, কিভাবে পূর্ব বাংলার পত্রিকার সম্পাদকদের ডেকে বলা হয় ‘আপনি এটা লিখতে পারবেন না, আপনি সেটা লিখতে পারবেন না’। এমনকি তারা সত্যও তুলে ধরতে পারে না। আমি এটা প্রমাণ করে দিতে পারি। কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে লিখতে গেলে সরকারের পক্ষ থেকে আদেশ জারী হোক কিংবা কোন একজন কেরানি লিখুক, ওপর থেকে নির্দেশ আসে ‘আপনারা এসব নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন না। এমনকি একবার এক সাব ইন্সপেক্টর পর্যন্ত এসেছিল সংবাদপত্রে বিশেষ কিছু লেখা বন্ধ করার জন্য। এ ব্যাপারটি মিস্টার হারুন ভালো করেই জানেন। কারণ, মাঝেমধ্যে তার পত্রিকার ওপরেও সেন্সরশীপ আরোপ করা হতো।

মাননীয় স্পিকার, আমরা এখানে আইন প্রণয়ন করতে এসেছি দেশের সকল মানুষের জন্য, এখানে বসা আশিজন ব্যক্তির জন্য নয়। ইতোমধ্যেই আমি আপনাকে উদাহরণ দিয়েছি ক্ষমতায় থাকা আমার বন্ধুরা কেমন আচরণ করছে আমাদের সঙ্গে।

মাননীয় স্পিকার, আমাদের সংবিধানে থাকা বার্তার দিকে যদি লক্ষ্য করেন, তাহলে দেখতে পাবেন, ওখানে লেখা রয়েছে আইন আরোপের শর্তপূর্বক গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দেয়া হলো। কিন্তু লক্ষ্য করুন, এর মাধ্যমে সরকার নিজেদের সুবিধার্থে যেকোন আইন প্রয়োগ করে পরোক্ষভাবে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। সরকার তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যে কাউকে বলতে পারবে, “তোমাদের চিঠিপত্র সেন্সর করা হবে, তোমাদের ফোনকল চেক করা হবে এবং তোমরা এমনকি কোথাও বেরোতে পারবে না।’ অতএব, মুক্তভাবে মত প্রকাশ এবং লেখার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবী।

তাই মাননীয় আইনমন্ত্রীর কাছে আমি সবিনয় অনুরোধ করছি, সকল স্বাধীনতার ক্যাটাগরি উল্লেখপূর্বক মিস্টার মাহমুদ আলী কর্তৃক উত্থাপিত যাবতীয় সংশোধনী তিনি যেন আমলে নেন। যাতে পাকিস্তানের মানুষ অন্তত এটুকু বলতে পারে যে, দেশের সংবিধানে তাদের জন্য একটু হলেও অধিকার সংরক্ষণ করা হয়েছে।

শেখ মুজিবুর রহমানঃ মাননীয় স্পিকার, এখন আমি জনাব ফজলুর রহমানের সাথে একমত পোষণ করে মাননীয় আইনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, বন্ধুরাষ্ট্রসমূহের সাথে বিভিন্ন বিষয় আলোচনা বা চুক্তির ব্যাপারে কথা বলার জন্য ওপর যেন কোন নিষেধাজ্ঞা না থাকে সে ব্যাপারে তিনি যেন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ইতোমধ্যেই মনসুর আহমেদ এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। নতুন করে আমি আর কিছু না বলে ফজলুর রহমানের সংশোধনীকে সংসদে গ্রহণ করার জন্য মাননীয় আইনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমি বুঝতে পারছি না বন্ধুরাষ্ট্রের সাথে কোন চুক্তির বিষয়ে আমরা আমাদের মতামত প্রকাশ করলে সমস্যা কোথায়।

এসব ব্যাপারে কথা বলার জন্য গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকা উচিত। তাছাড়া এসব আলোচনা ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিবর্গের কোন ক্ষতি করবে না। আজ যদি মিস্টার ফজলুর রহমানের আনীত সংশোধনী গৃহীত না হয়, তাহলে সরকার ফের আলোচনার ওপর অহেতুক চাপ প্রয়োগ করে হয়রানি করবে। তারা এটা করবেই। কারণ তারা ক্ষমতায় রয়েছে। তাই আমি সরাসরি মাননীয় আইনমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাচ্ছি, জনগণের জন্য সুশৃঙ্খল এক সংবিধান রচনার স্বার্থেই ফজলুর রহমানের সংশোধনীকে গ্রহণ করে নেয়া হোক। কারণ, এই সংশোধনীর বিষয়গুলো পাকিস্তানের নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের উপাদান। আমি কেবল একটা কথা বলতে চাই। প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই দুটি দল থাকে। একটি ক্ষমতায় থাকে, আরেকটি দল হয় তাদের প্রতিপক্ষ। একদল ক্ষমতা থেকে নামবে, আরেক দল আসবে। কিন্তু রাষ্ট্র থেকে যাবে তার জায়গায়, জনগণ থেকে যাবে তাদের অবস্থানে সবসময়। যাইহোক, ক্ষমতায় থাকা দলটি যখন পার্শ্ববর্তী কোন রাষ্ট্রের সাথে বিভিন্ন চুক্তি সম্পাদন করছে, যা কিনা পাকিস্তানের আর্থিক এবং অন্যান্য ক্ষেত্রের জন্য ক্ষতিকর। এখন বিরোধী দল কিভাবে ওসব চুক্তি নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবে, যেখানে তাদের কোন স্বাধীনতা নেই? মাননীয় স্পিকার, কিছু চুক্তি দেশ ও দশের জন্য খারাপ হতে পারে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকলে সেসব সম্পর্কে পয়েন্ট বাই পয়েন্ট ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরা যাবে, জনসচেতনতা তৈরি করা যাবে। কিন্তু এখানে সরকার মনে করে, তারা যেকোন দেশের সাথে যেমনই চুক্তি করুক, যেন সেটা দেশের জন্য ভালো। তা সত্ত্বেও, তারা মনে করে সারা দেশের মানুষ তাদেরকে খুব ভালো মনে করে। যেমনটা মুসলিম লীগও নিজেদের অবস্থানকে ইতিবাচক মনে করে, যদিও বাস্তবতা ঠিক বিপরীত। তো সরকার হয়ত এমন কিছু আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদন করবে যা দেশ ও জনগণের জন্য বেশ ক্ষতির হতে পারে। তাহলে সেসব ব্যাপারে যদি লিখে ও জনমত তৈরি করতে চায় গণমাধ্যম, এভাবে পরাধীনতা চলতে থাকলে মানুষ কিভাবে মত প্রকাশ করতে সক্ষম হবে? মাননীয় স্পিকার, আপনি জানেন আমাদের দেশ ইতোমধ্যেই বেশকিছু বৈদেশিক চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এই যেমন-সিয়েটো চুক্তি, বাগদাদ চুক্তিসহ অন্য আরো চুক্তি। অনেক ব্যক্তিই এসব চুক্তি পছন্দ করেন না। তাদের এসব চুক্তির ক্ষতিকর দিক নিয়ে লেখার অধিকার থাকা প্রয়োজন। দেশের কিছু পত্রিকা সরকারের পক্ষে লিখবে, কিছু পত্রিকা বিরুদ্ধে লিখবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার জানা নেই মাননীয় আইনমন্ত্রী এই বিজ্ঞ সংসদে বিশ্বের এমন কোন সংবিধানের উদাহরণ দেখাতে পারবেন কিনা যেখানে লেখা রয়েছে দুটি বন্ধু দেশের মধ্যে হওয়া চুক্তি সম্পর্কে রাষ্ট্রের কেউ আলোচনা করতে পারবে না, লিখতে পারবে না। বিশ্বের বুকে আমরা সবাই একে অপরের বন্ধু রাষ্ট্র। অনেক দেশের সাথেই অপর দেশগুলোর ভালো সম্পর্ক বিদ্যমান। কিন্তু তাদের মধ্যেকার চুক্তিগুলোকে কে যাচাই করবে? সরকার হয়তো বলবে, তারা বিবেচনা করবে। কিন্তু জনগণ বলবে-না, সরকার এই চুক্তি সম্পন্ন করে ভালো করেনি। যে দেশকে আমাদের বন্ধু বলে গণ্য করা হচ্ছে সেটি আসলে বন্ধুর বেশে শত্রু দেশ।

জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে সরকার ফের বলবে, এটা আমাদের বন্ধু দেশ, ওটা আমাদের বন্ধু দেশ। দিনশেষে তারা হয়ত এটাও বলে দেবে, জনগণের চিন্তাকে মূল্য দিয়ে সরকার চলবে না। তাহলে চিন্তা করুন মাননীয় মহোদয়, সরকার কতটা একপেশে চিন্তাভাবনা করছে। পাকিস্তানের জনগণ, এমনকি পাকিস্তানে যে আরো রাজনৈতিক দল রয়েছে সে ব্যাপারেও তাদের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সরকার কেবল একটি দল কায়েম করতে চায়। কারণ, শুধু একটি দল থাকলে সমস্ত পাকিস্তানে তাদের কর্মকান্ডের সমালোচনা করার মত আর কেউ থাকবে না। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, আমাদের সরকার সমালোচনা নিতেই চায় না। তারা যেমন বৈদেশিক চুক্তিই সম্পাদন করুক না কেন, জনগণকে সেসব মেনে নিতে বাধ্য করা হয়। এই হচ্ছে মূল পয়েন্ট। আপাতদৃষ্টিতে বর্তমান বিলের দিকে মনে হবে এসব চুক্তি আসলে ক্ষুদ্র বিষয়, কেন সবাই এসব নিয়ে আলোচনা করবে? কিন্তু মাননীয় স্পিকার, এটি আসলে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যাইহোক, মিস্টার ইউসুফ হারুন এ বিষয়ে তার দলের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দিতে প্রস্তুত…

মিস্টার এ ইউসুফঃ একই বিষয় আসলে বারবার পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে। তারা নতুন কোন যুক্তি এগিয়ে নিতে পারছে না এসব বিষয়ে। সবসময় একই বিষয়ে সব আটকে যাচ্ছে।

শেখ মুজিবুর রহমানঃ মাননীয় স্পিকারের মাধ্যমে আমি মাননীয় আইনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এবং সহযোগী দলগুলোর সমর্থন আশা করে বলতে চাচ্ছি, বিদেশের সাথে পাকিস্তানের যত বৈদেশিক চুক্তি সম্পাদনা করা হবে, সে ব্যাপারে গণমাধ্যমে কথা বলার মতো অধিকার দিয়ে যেন এই সংশোধনীকে অনুমোদন দেয়া হয়। এটি পাকিস্তানের জনগণের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। কেননা, পাকিস্তান সরকার যদি কোন দেশের সাথে ভুল চুক্তি করে, তাহলে এতে নিশ্চিত রাষ্ট্রের বড় রকমের ক্ষতি হয়ে যাবে। তাহলে এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের কথা বলার অধিকার থাকা উচিত নয়কি? এসব বিষয় বিবেচনা করে আমি মাননীয় মন্ত্রীকে অনুরোধ করব এই সংশোধনীর অনুমোদন দেবার জন্য।

শেখ মুজিবুর রহমানঃ মাননীয় স্পিকার, আমার বন্ধু জনাব হামিদুল হক বললেন এই প্রথম আমরা কিছু বলার মত মৌলিক অধিকার পেতে যাচ্ছি। ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভের পর এই প্রথম মৌলিক অধিকার পেতে যাচ্ছি। তৎকালে (ব্রিটিশ পিরিয়ডে) আমরা কথা বলার, জনমত প্রকাশ করার এবং মিটিং করার অনুমোদন পেতাম। কিন্তু ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরবর্তী সময়ে এই প্রথম আমরা আমাদের মৌলিক অধিকার পেতে যাচ্ছি এবং আমি মনে করি সংসদ কর্তৃক একে অনুমোদন দেয়া উচিত।

মাননীয় স্পিকার, জনাব হামিদুল হক সাহেব হয়ত মনে করতে পারবেন ১৯৪৮ সালের কথা। তিনি তখন পূর্ব বাংলার মূখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের অধীনস্ত কেবিনেটের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। আমরা তখন ভাষার জন্য আন্দোলন করেছিলাম। বাংলা রাষ্ট্রভাষা দিবস ঘোষণা করেছিলাম। ফলশ্রুতিতে, সরকার আমাদের ওপর লাঠিচার্জ করে। রাষ্ট্রে ১৪৪ ধারা জারী করে এবং আমি ও আমার সহযোগী বন্ধুদেরকে গ্রেফতার করে জেলে প্রেরণ করে। হামিদুল হক সাহেব নিশ্চয়ই জানেন কত কষ্ট করে স্বাধীনতার পর্দা উন্মোচন করতে হয়েছিল আমাদেরকে।

ডেপুটি স্পিকারঃ আপনি তখন কিভাবে মুক্তি পেলেন?

শেখ মুজিবুর রহমানঃ মাননীয় স্পিকার, আমি বেশ কয়েকবার জেলে গিয়েছি এবং জেল থেকে মুক্তি পেয়েছি নিজের সাহসিকতার কারণে। সংসদে উপস্থিত সাংসদের মধ্যে অনেকেই জানেন আমিই পূর্ব বাংলায় সবচাইতে বড় মিটিংয়ে বক্তৃতা দিয়েছি……..

আমাদের আন্দোলন বন্ধ করার জন্য সেসময় ১৪৪ ধারা জারী করা হয়েছিল। আমার পর্যবেক্ষণ বলছে এই ১৪৪ ধারা নানা সময়েই আরোপ করা হয় আমাদের ওপর। আমরা এই ১৪৪ ধারা থেকে মুক্তি চাই। আমরা চাই এটা বাতিল হোক। আমরা চাই আমাদেরকে এই অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেয়া আইন হতে মুক্ত করতে। আমরা অনেক ভোগান্তি সয়েছি। উদাহরণস্বরূপ, মিস্টার সোহরাওয়ার্দী যখন কোন মিটিংয়ের প্রস্তুতি নিতেন, তখন কোন একজন সাব ডেপুটি কালেক্টর কিংবা ম্যাজিস্ট্রেট গিয়ে হাজির হয়ে বলতে পারতেন, “আমি এখানে বিশৃঙ্খলা চাই না। আমি ১৪৪ ধারা প্রয়োগ করব। মিস্টার সোহরাওয়ার্দী আপনি এখান থেকে এখনই চলে যান।” অন্যায় আইনের বিরুদ্ধে এটাই আমার প্রথম যুক্তি।

ডেপুটি স্পিকারঃ আপনার দ্বিতীয় যুক্তি কী?

শেখ মুজিবুর রহমানঃ মাননীয় স্পিকার, আমার দ্বিতীয় যুক্তি হচ্ছে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন নিয়ে। মাননীয় স্পিকার, কেমন একটা এলোমেলো যুক্তি দিয়েছেন আমাদের বৈদেশিক মন্ত্রী, যিনি বাইরের রাষ্ট্রের সাথে আমাদের সকল সম্পর্ক দেখাশোনা করেন এবং বিদেশের জনগণের সাথে মতবিনিময় করেন। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে করাচি এবং এর বাইরে থাকা কুটনীতিবিদের সাথে রাষ্ট্রের নানা বিষয়ে আলোচনা করেন। মাননীয় স্পিকার এমন একজন ব্যক্তি যখন পাকিস্তানকে উপস্থাপন করে বহির্বিশ্বে তখন আমাদের দেশের জনগণ যাবে কোথায়? তার কর্মকান্ড এতটাই বাজে যে, বহির্বিশ্বে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি যতোটুকু রয়েছে, তিনি সেটাও নষ্ট করবেন এবং পাকিস্তানের সম্মানকে আরো নিচে নামিয়ে দেবেন। তিনি আমাদেরকে অর্থনৈতিক, বিক্রয় শুল্ক, শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য কোন প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করতে দিচ্ছেন না, কিন্তু তিনি কেবল আমাদেরকে মৌলিক অধিকারের জায়গাটুকুতে কিঞ্চিৎ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করতে দিচ্ছেন। মাননীয় স্পিকার, মৌলিক অধিকারের বিষয়টি এখন প্রাদেশিক বা কেন্দ্রের কোন প্রশ্ন নয়, এটি একটি প্রদেশকে ঘিরে প্রশ্ন, এটি পাকিস্তানকে ঘিরে এক প্রশ্ন। আমি জানি না এটাকে কিভাবে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন বলা যায়। তারা পূর্বেও আমাদের ওপর বিভিন্ন চাপ প্রয়োগ করতো, এখন সেটা ক্ষমতার মাধ্যমে আরো বেশি প্রয়োগ করছে।

মাননীয় স্পিকার, পাকিস্তান একটি গণতান্ত্রিক দেশ। এর সংবিধানকে আমরা একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান হিসেবেই মানি। তাহলে উক্ত সংবিধানে কেন জনগণের অধিকারকে খর্ব করা হলো? আপনি ইতালির সংবিধানের দিকে তাকান। সেখানে জনগণের অধিকারকে কত সুন্দরভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। তারা এটা করেছে স্বৈরশাসক মুসোলিনি কর্তৃক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর। মুসোলিনি একজন স্বৈরশাসক ছিলেন। তিনি ইতালিতে সকল বিরোধী দলগুলোকে ধ্বংস করেছেন। বিরোধী দলের নেতাদেরকে হত্যা করেছেন। মুসোলিনিকে যখন হত্যা করা হয়, তখন ইতালিতে সবাই একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনার জন্য বদ্ধপরিকর হয়েছিলো তাদের দেশকে পরবর্তী কোন স্বৈরশাসকের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। তারা জনগণের অধিকারকে মর্যাদা দেয়। তাহলে আমাদের দেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়েও, কবে এখানে জনগণের অধিকারকে মর্যাদা দেয়া হবে এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার পেছনে এখানে কী এমন জটিলতা কাজ করছে আমি তা ভেবে পাই না। মাননীয় স্পিকার, মাননীয় আইনমন্ত্রী এখানে উপস্থিত নেই। কিন্তু আমি জানি না মিস্টার রাশিদির কাছে এই প্রস্তাবনা তুলে ধরলে তিনি উপস্থাপনের দায়িত্ব নেবেন কিনা……..

পীর আলী মুহাম্মদ (পাকিস্তান মুসলিম লীগ)- হ্যাঁ, আমি আপনার দাবী উত্থাপন করব।

শেখ মুজিবুর রহমানঃ ধন্যবাদ। আপনি জানেন কিভাবে এটি উপস্থাপন করতে হবে। মাননীয় স্পিকার, আমি আইনমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাতে চেয়েছি। কিন্তু তিনি এখানে উপস্থিত নেই। যাইহোক, আমি উপস্থিত সবার কাছে আবেদন জানাতে চাই এই সংশোধনী গ্রহণ করা হোক। আজকে আপনারা ক্ষমতায় আছেন। কালকে ক্ষমতায় নাও থাকতে পারেন। হয়তো কালকে বিরোধী দল হিসেবে আপনাদের অবস্থান হবে। এই ১৪৪ ধারা তখন আপনাদের মিটিংয়েও ব্যবহৃত হবে অন্যায়ভাবে। ইসলামের নামে তাই, যেহেতু আপনারা ভোটের সময় ইসলামের আবেগকে ব্যবহার করেন, অনুরোধ থাকবে এই সংশোধনী মেনে নিন। দেখিয়ে দিন পাকিস্তানের একটি ইসলামিক সংবিধান রয়েছে এবং এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।

অনুবাদ- ত্বাইরান আবির (লেখক/অনুবাদক)


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *