নিজের বর্তমান অবস্থানকে ভালোবাসুন

আপনাদেরকে একটা প্রশ্ন করি। প্রশ্নটা হচ্ছে- কষ্ট করতে কে চায় বলুন? কিংবা কষ্ট পেতে কারা ভালোবাসে?

ব্যক্তিগতভাবে আমি কখনো কষ্ট পেতে ভালোবাসিনি। আমি সবসময়ই সুখ পেতে চেয়েছি। আমি জানি আপনারাও কষ্ট পেতে ভালোবাসেন না, কষ্ট করতে ভালোবাসেন না, পেতে চান সুখ। নিজের জন্য আমি আজকে কষ্ট করলেও আগামী দিনের জন্য সুখ আশা করেছি সবসময়ই। শুধু আমি কিংবা আপনি নই, জগতের সবাই আসলে সুখের সন্ধানে যাত্রা শুরু করে, সবসময়ই করে চলেছে। আসলে আমরা সবাই দৌড়াচ্ছি। কিন্তু কীসের জন্য? এর উত্তরে জবাব আসবে- সুখ। একটু সুখ পেতে দুরন্তভাবে ছুটে চলেছি আমরা, বিরামহীন। এই সুখ আসলে কেমন? আমরা আসলে কোন সুখের পেছনে বিরামহীন ছুটে নিজের বর্তমান অবস্থানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছি? কোন সুখের জন্য সন্তুষ্টিকে ছেড়ে দিয়েছি আমরা? আমি যদি একটু স্পষ্ট করে বলি- এটা আসলে নানা বিষয় পাওয়ার সুখ, নানা কিছু অর্জনের সুখ। আমাদের এটা পেতে হবে, ওটা করতে হবে, ঐ জায়গায় যেতে হবে- এমন অস্থিরতার শেষ নেই। বর্তমানে প্রায় সবার মনেই অস্থিরতা চেপে বসে আছে। আর এসব অস্থিরতা আসে আকাঙ্ক্ষা থেকে। আকাঙ্ক্ষা আবার চলে আসে নতুন কিছু দেখার মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ- আপনি নতুন কোন জিনিস মার্কেটে আসতে দেখলেন কিংবা আপনার বন্ধুকে অনেক সুন্দর একটি জায়গায় বেড়াতে যেতে দেখলেন, অথবা নিয়মিত সুন্দর পোশাক পরতে দেখলেন, তখন আপনার মনেও স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তৈরি হয় আকাঙ্ক্ষা।

ইশ! আমিও যদি এটা কিনতে পারতাম! (সুনির্দিষ্ট বস্তু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা)

কত সুন্দর জায়গা! যদি আমি যেতে পারতাম! (ব্যয়বহুল জায়গায় ঘোরার আকাঙ্ক্ষা)

আহা! আমার যদি এত সুন্দর একটি বাড়ি থাকতো! (বিলাসবহুল বাড়ি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা)

আমি যদি অমন সুন্দর ড্রেস পরতে পারতাম! (আভিজাত্যের আকাঙ্ক্ষা)

এমন নানা বিষয় আমাদের মনে আসে। স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আসে। মানব মন আসলে এভাবেই তৈরি। আপনি কোনকিছু দেখবেন, ভালো লাগবে, অতঃপর তা নিজের করে পেতে চাইবেন। এই চাওয়াটাই আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে, যা পূরণে আমরা ছুটে চলি অবিরত। আকাঙ্ক্ষা আমাদেরকে তাড়া করে ফেরে। এই আকাঙ্ক্ষার জন্যই আমরা নিজেদেরকে নিয়ে কখনো কখনো হীনমন্যতায় ভুগি, বাকি মানুষদেরকে আমাদের চেয়ে সুপিরিয়র ভাবি। অতঃপর আমরা নিজেদেরকে ওসব মানুষের জায়গায় কল্পনা করতে পছন্দ করি। এই কল্পনাকে বাস্তব করার জন্য আমাদের নিরন্তর ছুটে চলা। কথা হচ্ছে, অন্যের অবস্থান দেখে আমরা নিজেদের অবস্থানকে অনুপযুক্ত মনে করি। এটা অনুচিত। আমরা যেই সুখ সুখ করে ছুটে চলি, এটা আসলে বিলাসিতা ও আর্থিক অবস্থানকে পাকাপোক্ত করার সংগ্রাম। আমি বলছি না আপনারা বিলাসিতা ও অর্থনৈতিক সফলতার জন্য ছুটবেন না। তবে খেয়াল রাখুন, এসবের পেছনে ছুটতে গিয়ে নিজের বর্তমান অবস্থানকে অনুপযুক্ত ভাববেন না যেন, ‘নেই নেই’ করে নিজের বর্তমান অবস্থানকেও বিষিয়ে তুলবেন না। আপনি ছুটবেন ঠিক আছে, তবে ভারসাম্য বজায় রেখে ছুটতে হবে আপনাকে। নিজের বর্তমান অবস্থানেই আপনাকে সুখ অনুভব করতে হবে। বর্তমানকে মেনে নিয়েই ভবিষ্যতের জন্য আপনাকে কাজ করতে হবে। সৃষ্টিকর্তা সবাইকে সবদিক থেকে পরিপূর্ণ করে পৃথিবীতে প্রেরণ করেননি। আপনি যদি নিজের বর্তমান অবস্থানকে নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে দারুণ কিছু করতে পারলে বর্তমান ও ভবিষ্যত দু’টো নিয়েই গর্ব করতে পারবেন। যদি ভবিষ্যতে ব্যর্থও হন, তাহলে নিজের বর্তমান দিন সুখে কাটানোর স্মৃতি আপনার রয়ে যাবে। কিন্তু যদি বর্তমানকে নিয়ে অসুখী হন, হীনমন্যতায় থাকেন কিংবা মেনে নিতে না পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে ব্যর্থ হলে আপনার জীবন চূড়ান্ত ব্যর্থ। আর যদি সফল হতে পারেন, তবুও জেনে নিন, আপনার জীবনের লম্বা একটা সময় আপনি অসুখী হয়ে কাটিয়েছেন (হীনমন্যতায় ভোগা বর্তমানের সময়গুলো)। সর্বশেষ আরো একটি কথা মনে রাখতে পারেন আপনি। আর তা হচ্ছে-

জীবন অনিশ্চিত। ভবিষ্যত অনিশ্চিত। আপনি যতই কাজ করুন না কেন, ভবিষ্যতে নিজের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন কিনা তার কোন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু আপনার বর্তমানই আপনার সবকিছু। বর্তমানকে মাড়িয়েই আপনি ভবিষ্যতে যান। আজকে যা বর্তমান, সেটাই একদিন আপনার ভবিষ্যত ছিলো। ভবিষ্যতে আপনি যা পান, তা আপনার বর্তমান কাজেরই ফলাফল। যখনই আপনি মনে করবেন আপনার বর্তমান জীবন নিয়ে আপনি অসুখী, তখনই আপনার জীবনে অস্থিরতা, হতাশা, হীনমন্যতা সব চলে আসবে। এতে করে একদিকে আপনার জীবন যেমন কষ্টের হবে, আরেকদিকে ভবিষ্যতের সফলতা অর্জন করতেও সকল রাস্তা জটিল হয়ে যাবে।

তাই বর্তমান অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকুন। বর্তমানকে ভালোবাসুন। আপনি যে হালেই থাকুন না কেন, জীবনকে সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে উপভোগ করতে শিখুন। এটাই জীবনের সার্থকতা। এরপর যদি আপনার পরিশ্রম আপনাকে বাড়তি কিছু উপহার দেয়, তখন সেটা গ্রহণ করে নিজেকে আরো সুখী করে তুলতে পারবেন আপনি। আপনার জন্য রইলো শুভকামনা।

© ত্বাইরান আবির


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *