রেড সি রিসোর্টের পেছনের চমকপ্রদ সত্য

সুদানের মরুভূমিতে লোহিত সাগরের তীরের একটি ছোট্ট পর্যটন গ্রাম ‘অ্যারোস’। ডাইভিং আর মরুভূমিতে আনন্দ করার নানা উপকরণ রাখা ছিলো সেখানে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষের জানা নেই, এই রিসোর্টটি আসলে ইসরায়েলি গুপ্তচরদের ব্যবহার করা একটি গ্রাম ছিলো, যা পুরোপুরি রিসোর্টের আদলে গড়ে তোলা হয়েছিলো।

রিসোর্টের বিজ্ঞাপনে সাগর পাড়ের চমৎকার সৈকতের পাশাপাশি যুগলের স্কুবা করার বা মাছ ধরার ছবি সাজানো। সেটিতে লেখা রয়েছে- ‘এখান থেকে স্বর্গের দেখা মেলে’। ইউরোপের বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে এখানে বুকিং দেয়া যায়। একই সঙ্গে এক হাজার অতিথি এখানে বাস করতে পারে এখানে। সুদান সরকারের কাছ থেকে ইউরোপীয় ব্যবসায়ীর একটি দল এই জায়গাটি লিজ নিয়ে রিসোর্টটি গড়ে তোলে। যেখানে প্রায়ই বিদেশি অতিথিরা বেড়াতেও আসেন।

কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই আসলে সাজানো। এটি আসলে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের একটি ফ্রন্ট বেজ।

আশির দশকের প্রথমদিকে মোসাদের এজেন্টরা এই রিসোর্টটি গড়ে তোলে। এটি ছিল তাদের একটি মানবিক মিশনের অংশ। সুদানের শরণার্থী শিবিরগুলোতে হাজার হাজার ইথিওপিয়ান ইহুদি আটকে পড়ে ছিল। তাদের উদ্ধার করে ইসরায়েলে নিয়ে যাওয়াই ছিল মোসাদের মূল উদ্দেশ্য।

সে সময় এই রিসোর্টে কাজ করা একজন এজেন্ট গ্যাড শিমরন বলছেন- ”এটি ছিল একটি রাষ্ট্রীয় গোপন ব্যাপার, কেউ এ নিয়ে কথা বলতো না। এমনকি আমার পরিবারও এ বিষয়ে কিছু জানতো না।”

ইথিওপিয়ার ইহুদিরা বেটা ইসরায়েল গোত্রের সদস্য, যাদের সত্যিকারের অতীত ইতিহাস এখনো অজানা। অনেকে মনে করেন, তারা প্রাচীন ইসরায়েলের হারিয়ে যাওয়া ১০টি গোত্রের একটি। অথবা কুইন অব শেবা এবং কিং সলোমনের একজন পুত্রের বংশধর, যিনি ইথিওপিয়ায় ফিরে গিয়েছিলেন।

অনেকে মনে করেন, তারা আসলে ৫৮৬ খৃষ্টপূর্বাব্দে তখনকার জেরুজালেম এলাকা থেকে ইথিওপিয়ায় পালিয়ে যাওয়া মানুষজন। একসময় তারা সারা বিশ্বের ইহুদিদের থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলো এবং মনে করতো- তারাই বিশ্বের একমাত্র জীবিত ইহুদি।

১৯৭৭ সালে ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে অন্য অনেক কমিউনিটির লোকেদের সঙ্গে তাদের একজন সদস্য ফ্রেরেড আকলুম সীমান্ত অতিক্রম করে সুদানে আসেন এবং শরণার্থী সংস্থাগুলোর কাছে সহায়তা চেয়ে চিঠি লেখেন। এর একটি চিঠি মোসাদের হাতে পড়ে।

তখনকার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মেনাশেম বিগিন মোসাদকে আদেশ দেন এই ইহুদিদের উদ্ধার করে ইজরায়েলে নিয়ে আসার জন্য। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন- ইজরায়েল হলো সব ইহুদির আশ্রয়কেন্দ্র।

ফ্রেরেড আকলুমের মাধ্যমে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের কাছে বার্তা পাঠানো হয় যে, জেরুজালেমে যাওয়ার একটি ভালো উপায় রয়েছে। এরই ফলে তাদের ২৭০০ বছরের পুরনো স্বপ্ন পূরণের সুযোগ তৈরি হয়। এরপর প্রায় ১৪ হাজার বেটা ইসরায়েলি পায়ে হেটে ৮০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সুদানে আসেন। এই পথে আসতে গিয়ে অন্তত ১৫০০ মানুষ মারা গিয়েছিলো।

মুসলিম প্রধান দেশ সুদানের সঙ্গে ইজরায়েলের সম্পর্ক ভালো নয়। যেহেতু দেশটিতে ইহুদিদের বসবাস নেই, তাই শরনার্থীদের বলা হয়, তারা যেন সুদান কর্তৃপক্ষের কাছে কখনোই নিজেদের ধর্ম পরিচয় প্রকাশ না করে। এরপর শুরু হয় উদ্ধার অভিযান।

এই ইথিওপিয়ান ইহুদিদের ইজরায়েলে নিয়ে আসতে হলে লোহিত সাগর পাড়ি দিতে হবে। এজন্য ইজরায়েলি নেভির সহায়তা চান মোসাদ এজেন্টরা। তারা সহায়তা করতে রাজি হন। এরপর মোসাদের কয়েকজন এজেন্ট লোহিত সাগরের তীরে গিয়ে একটি সুবিধামত জায়গা খুঁজে বের করেন।

ইতালিয়ান ব্যবসায়ীরা ১৯৭২ সালে সেখানে ১৫টি বাংলো তৈরি করেন। একটি রান্নাঘর ও বড় খাবারের ঘর তৈরি হয়। কিন্তু পানি আর বিদ্যুতের অভাবে রিসোর্টটি চালু হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন এজেন্ট জানান- অ্যারোস খুবই দুর্গম একটি জায়গা। মোসাদ পেছনে না থাকলে সেটি চালানোই সম্ভব হতো না কারো পক্ষে।

ইতালিয়ানরা রিসোর্ট সচল রাখতে ব্যর্থ হয়। তারপর ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহার করে সুইস অপারেটিং কোম্পানির ছদ্ম পরিচয়ে একদল মোসাদ এজেন্ট সুদান সরকারের কাছে গিয়ে এই গ্রামটি লিজ নেয়ার প্রস্তাব করে এবং তিন বছরের জন্য প্রায় সোয়া তিন লাখ ডলারের বিনিময়ে ভাড়া নেয়।

প্রথম বছর জুড়ে তারা পুরো গ্রামটি নতুনভাবে সাজায়। তবে বিশুদ্ধ পানি আর জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে স্থানীয় একজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে তাদের সমস্যাও হয়। যাইহোক, রিসোর্স পরিচালনায় স্থানীয় ১৫ জনকে চালক, পাচক, ওয়েটার ইত্যাদি পদে চাকরি দেয়া হয়, যাদের বেতন নির্ধারণ করা হয়েছিল দ্বিগুণ। কিন্তু এই কর্মীরা জানতো না রিসোর্টের পেছনের কাহিনী। তাদের ম্যানেজার একজন মোসাদ এজেন্ট ছিলো, এটাও তারা ঘুনাক্ষরে কল্পনা করতে পারেনি। তারা যেন সন্দেহ না করে কখনো সে কারণে দিনের কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য কয়েকজন নারী এজেন্ট নিয়োগ করা হয়েছিলো।

আর রাতের বেলায় মোসাদ এজেন্টরা গিয়ে ইথিওপিয়ান ইহুদিদের ছোট ছোট দলকে এই রিসোর্টে নিয়ে আসতো। এসব নিয়ে আগেভাগে কোন তথ্যই জানানো হতো না শরনার্থী ইহুদিদেরকে। তারাও জানতো না ইজরায়েলি এজেন্টরা তাদের মুক্তির জন্য কাজ করে চলেছে। শরনার্থীদের কাছে নিজেদেরকে ভাড়াটে সৈনিক হিসেবেই পরিচয় দিতো মোসাদের এজেন্টরা।

ট্রাকে করে শরনার্থীদেরকে এই রিসোর্টের উত্তর প্রান্তে নিয়ে আসার পর ইজরায়েলি নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী আর সিল সদস্যরা ছোট নৌকায় করে দেড় ঘণ্টা ভ্রমণ করে তাদেরকে আরেকটি জাহাজে নিয়ে যেতো। সেখান থেকে লোহিত সাগর হয়ে তাদেরকে ইজরায়েলে পৌঁছে দেয়া হতো।

১৯৮২ সালের মার্চে মোসাদ সদস্যদের তৃতীয় অভিযানটি বুঝে ফেলে সুদানের সেনা সদস্যরা। তাদের সঙ্গে গোলাগুলিও হয়। কিন্তু কেউ হতাহত হয়নি। এরপর থেকে সাগর পাড়ি দেয়ার পরিকল্পনাটি স্থগিত করা হয়। তার বদলে মরুভূমির মাঝে একটি সুবিধাজনক স্থানে বিমান অবতরণের ক্ষেত্র খুঁজে বের করে এজেন্টরা। সেখান থেকে হারকিউলিস বিমানে করে শরণার্থীদের ইজরায়েলে নিয়ে আসা হতো।

কিন্তু এরপরেও ওই রিসোর্টটি পরিচালনা অব্যাহত রাখে মোসাদ এজেন্টরা। সময়ে সময়ে সেখানে বেড়াতে গেছে মিশরের সেনাবাহিনী, ব্রিটিশ এসএএস সৈন্যরা, সুদানি আর ব্রিটিশ কূটনীতিকরা। কিন্তু তাদের কেউ জানতো না এর পরিচালকদের আসল পরিচয়।

এরপর কিছুদিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আর বড় অংকের অর্থ লেনদেনের বিনিময়ে সুদানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল জাফর নিমিরি সরাসরি খার্তুম থেকেই ইহুদিদের ইউরোপে যাবার অনুমতি দেন। তারা ব্রাসেলস হয়ে ইজরায়েলে পৌঁছাতো। কিন্তু আরব বিশ্বের কেউ এ কথা জানতো না।

তবে সুদান থেকে শরণার্থীদের বিমান ব্যবহার করে বের করে আনার খবরটি ১৯৮৫ সালের ৫ই জানুয়ারি বিশ্বের বড় বড় সংবাদপত্রগুলোয় প্রকাশিত হয়। এরপর সুদান সরকার এই অভিযান বন্ধ করে দেয়। তবে রিসোর্টটি পরিচালনা অব্যাহত রাখে মোসাদ। যদিও তখন আর তাদের এর পেছনে কোন খরচ করতে হতো না, কারণ পর্যটকদের কাছ থেকেই পর্যাপ্ত মুনাফা আসতো।

কিন্তু ১৯৮৫ সালের ৫ এপ্রিল সুদানে সামরিক অভ্যুত্থানের পর রিসোর্ট থেকে মোসাদ এজেন্টদের চলে আসার নির্দেশ দেন সংস্থাটির প্রধান। কারণ নতুন সামরিক সরকার এই রিসোর্ট আর মোসাদ এজেন্টদের নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করেছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এজেন্ট বলছেন- “এক রাতেই আমাদের ছয়জন সদস্য সেখান থেকে চলে আসি। তখনও রিসোর্টে অনেক পর্যটক ছিলেন। কিন্তু তারা সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন, স্থানীয় কর্মীরা রয়েছে, কিন্তু ডাইভিং ইন্সট্রাকটর, নারী ম্যানেজার আর সবাই লাপাত্তা হয়ে গেছে।”
এরপর থেকেই রিসোর্টটি বন্ধ হয়ে যায়।

তথ্যসূত্রঃ

বই- মোসাদ এক্সোডাস
লেখক- গ্যাড শিমরন
অনুবাদ- ত্বাইরান আবির


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *