উপলব্ধি

আমি ঘড়ির কাটার দিকে তাকিয়ে আছি। খুব ধীরেসুস্থে চলছে ওটা। টিক….টিক….টিক আওয়াজ ভেসে আসছে। স্থিরচিত্তে কোনকিছু খেয়াল করার সময় অল্প আওয়াজও মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। আমার ক্ষেত্রে সেটাই হচ্ছে। আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি ঘড়ির কাটার আওয়াজ, যদিও ঘড়িটির থেকে আমার দুরত্ব কম নয়। সেই দুরত্বকে ছাপিয়েই আমার কানে আওয়াজ ভেসে আসছে একটু পরপর। কেননা, আমি খুব মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করছি কাটার ঘুরে চলা। কত সুন্দর চলছে, একটু একটু করে ঘুরে চলেছে, কেটে যাচ্ছে সময়। এভাবেই কাটতে থাকে এক মুহূর্ত, এক প্রহর। শুরুটা হয় এক সেকেন্ড দিয়ে। তারপর এক মিনিট, এক ঘন্টা। চলতে চলতে শেষ হয় একটি সম্পূর্ণ দিন। দিন থেকে মাস হয়ে শেষ হয় বছরে গিয়ে। তারপর আরেক বছর চলে আসে। নতুন বছরে আমি হই আনন্দিত। কত ঘটা করে উৎসব পালন করি। স্বাগত জানাই। আমি স্বাগত জানাই নতুন সময়কে, নতুন গল্পকে, ঝেড়ে ফেলি আমার পুরোনো সব গল্প। আশাবাদী হয়ে উঠি নতুন সময়ে সবকিছু নতুনভাবেই চলতে থাকবে। কিন্তু কোনকিছুই বদলায় না। আমি সেই বৃত্তেই আটকে থাকি। সেই ঘড়ি, ঘড়ির কাটা আর ধীরস্থির ঘুরে চলা বৃত্তের টিক টিক শব্দ, যা এই মুহূর্তে আমি দেখতে পাচ্ছি। ঘড়িটিকে আজ আমার অদ্ভুত লাগছে। মনে হচ্ছে রহস্যময় কোন জিনিস ওটা। কেমন করে সময় কেড়ে নিচ্ছে, আমাকে উপলব্ধি করাচ্ছে- “সময় চলে যাচ্ছে, দেখো মানুষ, এক দুই তিন করতে করতে তোমার মূল্যবান সময় কেমন চলে যাচ্ছে। অথচ এই সময়কে তোমরা অবহেলা করে কাটাও। সময়কে তোমরা ব্যয় করো বাজে কাজে, সময়কে ব্যয় করো অহেতুক হাস্যরসের বিনোদনে। কখনো আবার সময়কে তোমরা ব্যয় করো মানুষকে কষ্ট দেবার কাজে। কখনো কি ভেবেছো প্রতিটি মুহূর্ত কত মূল্যবান তোমার জন্য? অথচ এই মুহূর্তই হতে পারে পৃথিবীর বুকে তোমার শেষ মুহূর্ত।” এইটুকু বোধ আমাকে এই ক্ষণে ঘুরেফিরেই দিচ্ছে ঘড়ির কাটা।

 

আমি এতদিন ঘড়ি দেখতাম। আজো দেখছি। কিন্তু আজকে কেমন যেন ঘোরের ভেতর পড়ে যাচ্ছি। ঘড়িটিকে নিখাদ বস্তু মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে এর ভেতর প্রাণ আছে। মনে হচ্ছে, আমাকে কিছু বলতে চায় সে। আর তাই হয়তো ওপরের চিন্তা আমার মাথায় আসলো। সত্যিই তো, কোনদিন সময়কে আমি নানা কাজে ব্যয় করি। এই ব্যয়ের কতটুকু যৌক্তিক আর কতটুকু অযৌক্তিক, সেটা আমিই জানি। সময় ব্যয়ের জায়গাগুলোই জানিয়ে দেয় মহাকালে আমার অবস্থান কেমন হবে, আমার সাথীরা (বিশ্বের সকল মানুষ) আমাকে কতটা মনে রাখবে। এই জায়গায় আমি আজো পিছিয়ে। আজো সময় ব্যয় হয়ে যায় বৃথা মোহের পেছনে। এখনো আমি বুঝি না স্থিরচিত্তে বসে দুদন্ড স্মৃতি স্মরণ করার মাঝে কতটুকু আবেগ জড়িয়ে, আমি বুঝি না জীবন শুধু ছুটে বেড়ানোর জন্য নয়। আমি মানুষের দুঃখ কষ্ট কিছুই বুঝতে চেষ্টা করি না, বিপদে পাশে দাঁড়াই না। আজ আমার নিজের স্বার্থই সবচাইতে বড় হয়ে দাঁড়ায়। অথচ আমি অনুভব করার চেষ্টা করি না, নিজের জন্য আকাশসম বিলাসিতার বাহার না করে পরের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হওয়ার মুহূর্তই আমার সময়কে যৌক্তিক কাজে ব্যয় করার বিষয়টি নিশ্চিত করে। তবুও এসব আমার করা হয় না। আমি আজ ব্যস্ত নিজের সুখের জন্য, জীবনের দীর্ঘ সময়ে সবার চেয়ে ‘বড়’ হওয়ার মাঝেই চলে যায় আমার সময়। আমার মাথায় আসে না, জীবনে বড় হওয়াই সব নয়। কারণ, মানুষের শেষটা শূন্যতা ও আঁধারে ভরা। এই চিরন্তন বাস্তবতাকে ভুলে যাই আমি। অথচ চাইলেই পারি নিজেকে শুধরে নিতে, নিজের সময়গুলোকে ভালো কাজে ব্যয় করতে। সীমাহীন ছুটে বেড়ানোর মাঝে নয়, বরং প্রতিটি ভালো কাজই আমার সময়ের সবচাইতে সঠিক ব্যবহারের জায়গাকে স্পষ্ট করে- এই সত্য বহুদিন হয়ে গেলেও আমি উপলব্ধি করতে পারিনি। আর তাইতো নিজের স্বার্থ পূরণের আগ্রাসী মনোভাবে মানুষকেও কতিপয় ক্ষেত্রে মানুষ মনে করি না। এই বার্তা এই মুহূর্তে আমাকে দিচ্ছে সময়, ঘড়ির ঘুরে চলা কাটা। হয়তো এজন্যই আজকে ঘড়ির কাটাকে আমার জীবন্ত মনে হচ্ছে, রহস্যময় লাগছে। “অদ্ভুত তো! ঘড়ির কাটা কেন এমন হবে? একটি বস্তু কীভাবে আমাকে শেখাতে পারে?” আমার মনে প্রশ্ন জাগছে। এ আমার অহংকারী মন। আমার স্বার্থপর মন। আমি বুঝতে পারছি এখন। আমার বোধোদয় হচ্ছে। ঘড়ির কাটা আমাকে উপলব্ধি করাচ্ছে জীবনের মানে, সময়ের মূল্য। আমার এখন অন্যরকম লাগছে। মনে হচ্ছে, অনেক কিছুই করার আছে। বহু সময় কেটে গেছে বেঘোরে। আর নয়। ফিরতে হবে নিজের আসল জায়গায়, নিজের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যের কাছে। হয়তো আমি পারবো। কারণ, নিজেকে আমি প্রশ্ন করতে শিখেছি, জেনেছি উত্তর করতে। নিজেকে আমার প্রস্তুত করতে হবে সকল ভালো কাজের জন্য। তাই ঘড়ির কাটা থেকে চোখ সরিয়ে নিলাম। রহস্যের আঁধার কেটে যাচ্ছে। ঘড়িতে শব্দ হচ্ছে টিক..টিক…টিক। পেছন ফিরে চলে যাচ্ছি আমি। এই মুহূর্তে মনে প্রশ্ন জাগছে-

“কতটুকু সময় গেলো উত্তম কাজে? কতটুকু সময় রইলো আমার অন্তিমকালে? কতটুকু?”

 

(সমাপ্ত)


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *