শক্তিশালী লেখকের গল্প

বর্তমান সময়ের পরিক্রমায় সাহিত্য পৌঁছে গেছে নতুন এক স্তরে। নতুন করে মানুষ বইয়ের দিকে ফিরতে শুরু করেছে। এই জায়গায় একটু হলেও ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া(ফেইসবুক)। তবে এসব সোশ্যাল সাইটের উপকারীতা এবং অপকারিতা উভয়ই আছে। মানুষ একদিকে প্রচুর পরিমাণে বই পড়তে শুরু করেছে, আরেকদিকে আলোর বিপরীতে অন্ধকার। বই নির্বাচনে নতুন পাঠকরা বরাবরের মতই ভুল করে চলেছে। পুঁজিবাদী সময়ের রঙচঙে জোরালো প্রচারমুখীতার কারণে ভালোমন্দ বাছাই করার বোধও যেন হারিয়ে ফেলেছে সবাই। পাঠের অযোগ্য বইয়ে সয়লাব হয়ে আছে সাহিত্যাঙ্গন। নতুনরা এসব না বুঝেশুনে স্রোতে গা ভাসানোর মতো কাজ করে চলেছে আজো। আগের মতো বাছাই করে বই পড়া কিংবা বোদ্ধা পাঠকদের কাছ থেকে বই সাজেশন চাওয়ার মত সমন্বয়ও আর নেই। এর ফলে হারিয়ে যাচ্ছে মানসম্মত বই, সেইসাথে প্রকৃত লেখকরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। এই চিন্তা থেকেই আমি ‘শক্তিশালী লেখকের গল্প’ সিরিজ চালু করেছি। প্রতিনিয়তই লিখে চলেছি বাংলা সাহিত্যের সম্ভাবনাময় সব লেখকের কথা। আজকের পর্বে আরো একজন শক্তিশালী লেখকের কথা আপনাদেরকে জানাবো, যিনি ইতোমধ্যেই পাঠকের মনে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছেন।

আজকের পর্বের লেখকের নাম- ওবায়েদ হক। বর্তমান সময়ে অনেক তরুণ লেখালেখি করে থাকেন। কিন্তু ক’জন পেরেছেন প্রকৃত পাঠকের মন জয় করতে? নিজেদের প্রচারমুখী কার্যক্রম দিয়ে অনেকেই হয়তো ফ্যান ফলোয়ার বাগিয়ে নিয়েছেন, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় জায়গা করে নিতে পেরেছে ক’জন? ওবায়েদ হক ঠিক এই কাজটিই করতে পেরেছেন। নিভৃতে লিখে যাওয়া এই মানুষটি বেশকিছু বই লেখার মাধ্যমে জানান দিতে সক্ষম হয়েছেন তিনি আসলে হারিয়ে যেতে আসেননি, দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে এসেছেন। বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘকাল টিকে থাকার মতো কাজ যেসব মানুষ করে চলেছেন, তাদেরই একজন ওবায়েদ হক। তার লেখার ধাঁচ, লেখার বিষয়বস্তু সবই বাংলাদেশকে ধারণ করে। সুনির্দিষ্ট কোন লেখক টিকে থাকেন আসলে তার লেখার নিজস্ব ধরণ এবং বিষয়বস্তুর জন্যই। এই জায়গায় ওবায়েদ হক নিজেকে বেশ ভালোমতোই প্রমাণ করেছেন। সামাজিক ঘরানায় নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করে নিতে সক্ষম হয়েছেন এই লেখক। অদূর ভবিষ্যতে নিজেকে আরো ছাপিয়ে যাবেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। সময় খুব দ্রুত বয়ে যায়, বর্তমান সময় আরো গতিশীল। গতিশীল এই বিশ্বের মাঝে কোন লেখক নীরবে তার গল্প লিখে চলেছেন, আর সেই লেখা কোন এক নীরব সময়ে পাঠক পড়ছেন- এই দৃশ্যটাই এখন আর নজরে পড়ে না তেমন। এমন অস্থির সময়ে বইয়ের জগতকে ধরে রাখতে, বইয়ের শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে দরকার শক্তিমান সব লেখক। কালের আবর্তনে বাংলা সাহিত্যে অনেক শক্তিমান সব লেখকের আবির্ভাব ঘটেছে। তাদের ক্ষুরধার লেখায় সমৃদ্ধ হয়েছে সাহিত্য জগত, তৃষ্ণা নিবারিত হয়েছে পাঠকের। কিন্তু বর্তমান সময়ের কোন কোন লেখক ভবিষ্যতকে জয় করতে পারে বলে মনে হয়? এমন প্রশ্ন করা হলে গুটিকয়েক লেখককে পাওয়া যাবে, বেশিরভাগই বাদ পড়ে যাবেন বিষয়বস্তু আর লেখার ধরণের বিচারিক কার্যক্রমে। যেই কম সংখ্যক লেখককে পাওয়া যেতে পারে ভবিষ্যতকে জয় করার তালিকায়, সেই সংকীর্ণ তালিকায় নিঃসন্দেহে স্থান পাবেন ওবায়েদ হক। আর সেটা তার গল্প বলার নিজস্ব ধাঁচ এবং বিষয়বস্তু নির্বাচনের জন্যই পাবেন।

নিজের লেখাকে পরম যত্নে লালন করেন ওবায়েদ হক। একবার তার কাছে এই প্রচারমুখী দুনিয়ায় এত এত প্রচারমুখী লেখকের ভীড়ে নিভৃতচারী হবার ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে ওবায়েদ হক জানান- “পাঠকরা চালুনিতে ছেঁকে নেবে, ধুলোবালি সব ছেঁকে মণি-মাণিক্য রেখে দেবে। আমি মনে করি ধুলোবালি প্রচারের কোন মানে হয় না। কোনদিন যদি মণি-মাণিক্য রচনা করতে পারি পাঠকেরাই খুঁজে নেবে। অবশ্য পাঠকেরা খুঁজে না নিলেও হীরা মণি-মাণিক্যের জৌলুস কমে যাবে না। অর্থ, যশ-খ্যাতি অনেক সময় লেখকের সৃষ্টিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।” এই কথাগুলোই আসলে সৃষ্টির সূক্ষ্মতার ব্যাপারে তার ধারণার জানান দেয়। একটি সৃষ্টি যে নিজস্ব উৎকর্ষতার কারণেই দীর্ঘকাল ধরে টিকে থাকে- তার ওপরের কথাটি আসলে সেই চিন্তারই বহিঃপ্রকাশ। একজন প্রকৃত লেখকের পক্ষেই সম্ভব নিজেকে আড়াল করে কেবল নিভৃতে লিখে যাওয়া এবং যত্ন সহকারে লিখে পাঠককে একের পর এক ভালো বই উপহার দেয়া। এইদিক দিয়ে লেখক ওবায়েদ হক শতভাগ সফল। তার লেখা পড়লেই স্পষ্ট হয় মেদহীন গল্প লেখার ধরণ। ঠিক যতটুকু দরকার, ততটুকুই তিনি লেখেন। এর বেশি বিস্তৃতি বা লেখাকে টেনে বড় করার মতো বিরক্তিকর প্রবণতা তার লেখার মাঝে দেখা যায় না। এটা তার বিশেষত্ব বলা চলে। ফলশ্রুতিতে পাঠক নিশ্চয়ই বিরক্তিতে পড়বেন না, লেখায় টান অনুভব করবেন। লেখার সাবলীল ভঙ্গির ফলে এক বসায় শেষ করার মতো লেখাই যার ধরণ, তিনি অদূর ভবিষ্যতে রাজ করবেন এটাই স্বাভাবিক।

 

যাহোক, এখন পর্যন্ত ওবায়েদ হকের সর্বমোট ছয়টি বই প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে। নীল পাহাড়, নেপথ্যে নেমকহারাম, তেইল্যাচোরা, জলেশ্বরী, কাঙালসংঘ, একটি শাড়ি এবং কামরাঙা বোমা ও অন্যান্য। তন্মধ্যে উপন্যাস চারটি- নীল পাহাড়, তেইল্যাচোরা, জলেশ্বরী এবং কাঙালসংঘ। বাকি দু’টি গল্পগ্রন্থ হচ্ছে- নেপথ্যে নেমকহারাম, একটি শাড়ি এবং কামরাঙা বোমা ও অন্যান্য। এই বইগুলোর মাঝে একটিতে পাহাড়িদের জীবনের দুঃখ দুর্দশা ও করুণ বাস্তবতা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বইটির নাম ‘নীল পাহাড়’। ওবায়েদ হকের এখন পর্যন্ত সেরা উপন্যাস বলা চলে এটিকে। প্রকাশিত হবার পরপরই ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পায় নীল পাহাড় উপন্যাসটি। নিভৃতচারী এক লেখকের বই যে আলোচনার খোড়াক হয়ে যেতে পারে পাঠকের মাঝে ‘নীল পাহাড়’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হবার পর সেটাই প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিলো। দুর্দান্ত স্টোরিটেলিং দক্ষতার সমন্বয় করে এই উপন্যাসে পাঠককে আটকে রাখতে সক্ষম হয়েছেন লেখক। এরপর আসবে তার ‘তেইল্যাচোরা’ উপন্যাসের কথা। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এই উপন্যাসও পাঠকের মাঝে সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছিলো। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অনুভব করার ক্ষেত্রে এই ধরণের লেখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ওবায়েদ হকের এই দু’টি বই বিশেষভাবে আলোচনায় উঠে আসার যোগ্য। লেখকের বাকি বইগুলোর মাঝে জলেশ্বরী উপন্যাস এবং গল্পগ্রন্থ নেপথ্যে নেমকহারামও বেশ ভালো সাড়া পেতে সক্ষম হয়েছিলো। ওবায়েদ হক আসলে এমন একজন লেখক, যার বই সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য পাওয়া দুষ্কর। দুই একজন ব্যতিক্রম থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে তিনি বর্তমান সময়ের আর সব তরুণ লেখকদের চেয়ে এগিয়েই থাকবেন। কারণ, সবাই যেখানে প্রোপার মার্কেটিং করাকেই নিজের এগিয়ে যাওয়ার নিয়ামক ভাবছেন, সেখানে নিভৃতচারী এই লেখক নিজের লেখাকেই অবলম্বন ধরে শক্তিশালী জায়গা তৈরি করে নিচ্ছেন। একদিন মার্কেটিং কথা বলবে না, লেখকের হয়ে কথা বলবে তার শক্তিশালী কনটেন্ট। ওবায়েদ হকের ক্ষেত্রে সেটাই হতে চলেছে এবং তিনি সেই পথেই এগোচ্ছেন। আমি এই দুরন্ত লেখকের প্রতি শুভকামনা জানাচ্ছি। ভবিষ্যতে তিনি আরো ভালো লিখবেন এবং বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করবেন এই আশাবাদ ব্যক্ত করেই শেষ করছি।


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *