শিল্প শব্দটির বিকৃতিকরণ: মেকি সাহিত্যবোদ্ধার অপলাপের প্রসঙ্গ

আমরা সচরাচর একটি ভুল করি। আর তা হলো- যেই বই, চিত্র কিংবা অন্যান্য বিষয় খুব ব্যবসাসফল হয়, প্রায়ই তখন আমরা সেটিকে “শৈল্পিক নয়” ট্যাগ দিয়ে ফেলি। বাঙালী জাতির এটি একটি স্বভাব। এই স্বভাব কোনকালে গড়ে উঠেছিলো, সেই ইতিহাস আমার অজানা। কিন্তু এমন মানসিকতার শিকড় যে বাংলার তথাকথিত শিল্পমনস্ক মানুষের মনে বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে আছে, এটা নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। উদাহরণস্বরূপ- একটা সৃজনশীল কর্ম প্রচুর পরিমাণ ব্যবসা করতে সফল হলো। অমনি শিল্পমনস্ক বোদ্ধার বেশ ধরে থাকা কিছু লোক বলে ওঠে “ওটায় বিন্দুমাত্র শৈল্পিক ছাপ নেই”। এর বিপরীতে আপনি যদি তাদেরকে প্রশ্ন করেন- তাহলে শৈল্পিক কর্ম আসলে কোনগুলো? তখন তারা আর কোন জবাব দিতে সক্ষম হয় না। কখনো কখনো বিদেশি কিছু উদাহরণ টানতে সক্ষম হয় বড়জোর৷ এই হচ্ছে সেসব বোদ্ধাদের দৌড়। প্রকারান্তে তাদের ভাবনা এমন যে, “কোন শিল্পকর্ম যদি ব্যবসাসফল হয়, তাহলে সেটা শৈল্পিক দিক দিয়ে উৎকৃষ্ট মানের নয়”। আজকের লেখাটি মূলত তাদেরকে নিয়েই লেখা। আমি যেহেতু লেখালেখির জগতে বসবাস করি। দীর্ঘদিন এ জগতে আমার বাস। তাই আপাতত লেখালেখি প্রসঙ্গেই বলতে চাই। প্রকাশ করতে চাই এ ব্যাপারে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি।

অমুকের লেখা শৈল্পিক নয়, অমুকের লেখায় শৈল্পিক গুণ নেই- এমন কথাবার্তা প্রায়ই শোনা যায়। সচরাচর সাধারণ মানুষ এসব মন্তব্য করেন না। সাধারণের ভেতর থেকে অসাধারণ হওয়ার চেষ্টায় থাকা মানুষেরা এমন বক্তব্য দিয়ে থাকেন। সবার পছন্দের চেয়ে নিজেকে একটু আলাদা করেন। নিজের মাঝে ধারণ করার চেষ্টা করেন এ্যাস্থেটিক ভাবগাম্ভীর্য। এর বাইরেও তারা গম্ভীর ভাব বজায় রাখেন। যাইহোক, যেসব লেখা নিয়ে তারা এসব মন্তব্য করেন, সেসব লেখা পড়লে বেশকিছু কারণ পাওয়া যায় তাদের এসব মন্তব্য করার পেছনে। দেখা যায় যেই লেখার, যেই বইয়ের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এসেছে, সেটির লেখা একটু সহজ। হালকা এবং সাবলীল। লেখার এই সহজতার জন্যই বহু সাহিত্যবোদ্ধা কতৃক বহু লেখাকেই খারিজ করে দেবার ইতিহাস রয়েছে। বহুকাল ধরেই বাংলায় এই প্রথা চালু আছে। এক্ষেত্রে তারা সুনির্দিষ্ট কোন লেখা নিয়ে যা বলেন- লেখায় গভীরতা নেই, লেখায় শিল্প নেই। এখন প্রশ্ন জাগে- শিল্প বলতে তারা আসলে কী বোঝেন? গভীরতার মানদন্ড তারা কীভাবে মাপেন? আমার মতে, কোন লেখা যখন সহজ ও সাবলীল হয়, তখন তা পাঠকের মনে সহজেই জায়গা করে নেয়। পাঠক সহজেই সেসব লেখার মর্মার্থ ও মাহাত্ম্য বুঝতে পারে। এমন লেখাকে “গভীরতা নেই” বলে খারিজ করে দেবার কোন যৌক্তিকতা দেখি না। এত সহজে মানুষের মনের মাঝে জায়গা পাবার বিষয়টিই বরং ব্যাপক গভীর বিষয়। তবে কেউ যদি লেখার বিষয়বস্তুকে গভীরতার প্রশ্নে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তাহলে সমস্যা ছিলো না। কিন্তু তারা বিষয়বস্তুকে নয়, বরং লেখার ধরণকে কেন্দ্র করে এমন অযাচিত মন্তব্য করে প্রতিনিয়তই। এতে লেখকের লেখার ব্যাপারে ভুল মেসেজ পৌঁছায় সবার কাছে। লেখকের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। তথাকথিত সেসব সাহিত্যবোদ্ধাদের বোঝা উচিত, কোন লেখার বিষয়বস্তু নিয়েই গভীরতা না থাকার প্রশ্নটি তুললে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। কিন্তু লেখার ধরণ সহজ ও সাবলীল হলে সেটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ঈর্ষাবশত লেখকের পেছনে লাগা খুবই নিন্দার কাজ। এহেন নিন্দনীয় কাজ করেও কেউ কেউ সাহিত্যবোদ্ধা সাজেন, দাঁত কেলিয়ে হাসেন এবং পাঠক সমাজে নিজেকে বাকি সবার থেকে আলাদা প্রমাণ করার ঘৃণ্য প্রচেষ্টায় লিপ্ত হন।

এখন আসি শিল্পের প্রসঙ্গে। আর্ট শব্দটিকেই অনেকে বিকৃত করে ফেলেছে আজকাল। বিকৃতির মাঝেই তাদের পৈশাচিক সুখ। শিল্প বলতেই তারা খারিজ করাকে বোঝেন। শিল্প বলতেই বাজে মন্তব্য করে আলোচনায় থাকা বোঝেন। “অমুক লেখায় শিল্প নেই”- এমন মন্তব্য হয়ত আপনারা দেখে থাকবেন। ওপরে আমি যেমন আলোচনা করেছি, ঠিক একই কারণে যেকোন লেখার বিষয়বস্তুকে বাদ দিয়ে লেখার ধরণ নিয়ে উপরি মন্তব্য করে ফেলে সাহিত্যবোদ্ধা সাজা লোকেরা। তারা বলে- লেখায় শিল্প নেই। আমি জানি না তারা শিল্প বলতে আসলে কী বোঝাতে চান! শিল্প মানে তাদের কাছে হয়তো দুর্বোধ্য শব্দ ব্যবহার করে লেখা গদ্যের চর্বিতচর্বন রূপ। মেদপূর্ণ লেখা হতে পারে তাদের কাছে শিল্প। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, সহজভাবে সহজ বার্তা পাঠকের কাছে পৌঁছে দেবার বিষয়টিকে তাদের কাছে শিল্প বলে মনে হয় না। তাদের কাছে শিল্প মানে “দুর্বোধ্যতা এবং নিজে লেখক যা লিখেছেন তা নিজেই বোঝেন না” এমন লেখা, নয়তো অখ্যাত কোন লেখকের লেখা। তথাকথিত এসব সাহিত্যবোদ্ধাদেরকে আমাদের বয়কট করা উচিত। কারণ, আমাদের সাহিত্যকে এগিয়ে নেবার পথে এমন নিরুৎসাহিত মন্তব্য ও অকাজের সাহিত্যবোদ্ধারা অন্তরায় হিসেবেই ভূমিকা পালন করে আসছে সবসময়।

আমাদের সবার জানা উচিত- সহজে সবাইকে সব বোঝাতে সক্ষম হওয়াটাই উৎকৃষ্ট শিল্প। সহজে বোঝানোর বিষয়টিই লেখার গভীরতার নির্ণায়ক। লেখার সহজ ও সাবলীল ধরণকে কেন্দ্র করে নেতিবাচক ও বাজে মন্তব্য যেন আমরা সকলেই পরিহার করি। বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে যেন আমাদের মন্তব্য হয়। ‘গভীরতা নেই’ বললে আমরা যেন বিষয়বস্তুকেই বলি। এর বাইরে ঈর্ষাবশত সমালোচনার নামে অহেতুক কুৎসা রটিয়ে নিজেকে সাহিত্যবোদ্ধা প্রমাণ করার চেষ্টা করলেও যে কেউ ব্যর্থ হবেন। নিজেই নিজেকে তখন স্বঘোষিত বোদ্ধা ভাবলেও, পাঠকেরা আপনাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে- সবসময়ই।


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *