আহমদ ছফা- একজন আপোষহীন লেখক

“কাউকে জ্ঞান বিতরণের আগে জেনে নিও যে, তার মধ্যে সেই জ্ঞানের পিপাসা আছে কি-না। অন্যথায়, এ ধরণের জ্ঞান বিতরণ করা হবে এক ধরণের জবরদস্তি। জন্তুর সাথে জবরদস্তি করা যায়, মানুষের সাথে নয়। হিউম্যান উইল রিভল্ট।”
– আহমদ ছফা

আহমদ ছফা। আমার কাছে অনন্য এক নাম। দু’হাতে যিনি লিখে গেছেন দুর্দান্ত সব বই। তার লেখা পড়লে ভক্ত হবে না, এমন মানুষ পাওয়া ভার। কিছু মানুষ থাকে, যারা পৃথিবীকে দেবার জন্যই আসে। আর কিছু মানুষ থাকে, যারা পৃথিবী থেকে শুধু নিয়েই যায়। আহমদ ছফা নিঃসন্দেহে প্রথম সারির মানুষ। তিনি পৃথিবীকে কিছু দেবার জন্যই এসেছিলেন। আমাদের ভাগ্য ভালোই বলতে হয়, এমন একজন লেখককে আমরা পেয়েছিলাম আমাদের দেশে। তার একেকটা লেখা রত্নসম। নিখাদ আদর্শকে ধারণ করে তিনি লিখে গেছেন, এমনটাই আমার কাছে মনে হয়েছে। “বাঙালি মুসলমানের মন” “যদ্যপি আমার গুরু” “ওঙ্কার” “গাভী বৃত্তান্ত” “অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী” “একজন আলী কেনানের উত্থান পতন”- এর মতন বই যার ঝুলিতে, তিনি কালের আবহে কোনদিন হারাবেন বলে আমার মনে হয় না। বোহেমিয়ান এই মানুষটি সারাজীবন একাই কাটিয়ে দিয়েছেন। সঙ্গী বলতে ছিলো লেখালেখি। জীবনে প্রেম এসেছিলো, কিন্তু সেখানে থিতু হওয়া হয়ে ওঠেনি তার। তাই একজীবন লেখালেখি করেই কাটিয়ে দিলেন। অবলম্বন হিসেবে ছিলো আদর্শ ও ন্যায়নীতি। চিন্তার গভীরতার হিসেব যদি ধরা হয়, তাহলে আহমদ ছফা বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম সেরা চিন্তাবিদ। তার লেখা “বাঙালি মুসলমানের মন” বইটি গত শতাব্দীতে বাংলাদেশে রচিত দশটি চিন্তাসংক্রান্ত বইয়ের অন্যতম সেরা বই হিসেবে বিবেচিত। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এবং সলিমুল্লাহ খানের মতে মুসলমানদের মানসিকতা নিয়ে দারুণ একটি বই “বাঙালি মুসলমানের মন”। এছাড়াও জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক স্যারকে নিয়ে লেখা তার কালজয়ী বই “যদ্যপি আমার গুরু” সকল পাঠকের জন্যই আদর্শ একটি বই। তাকে বলা হয় মীর মশাররফ হোসেন, কাজী নজরুল ইসলামের পরে সবচাইতে প্রভাবশালী মুসলিম লেখক। এই কথার প্রমাণ মিলে তার প্রত্যেকটি লেখায়। ছোট্ট পরিসরে লেখা বইগুলোতে তিনি বলে গেছেন সাধারণ মানুষের কথা। কখনো বলেছেন নির্যাতনের কথা, কখনোবা লেখার মাধ্যমে জানিয়েছেন প্রতিবাদ। এর বাইরে কল্পনার রুংতুলিকে বাস্তব করে লেখার মাধ্যমে অঙ্কন করেছেন ভণ্ডামিমুক্ত সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত এক সমাজ। তারই প্রতিফলন তার লেখায় পাওয়া যায়। নিশ্চয়ই সেসব একদিন পুরোপুরি বাস্তবায়ন হবে এই প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি।

আহমদ ছফাকে অনেকে হয়তো প্রাবন্ধিক মনে করতে পারেন, কিন্তু তিনি আসলে ভার্সেটাইল লেখক। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস হতে শুরু করে প্রবন্ধ, পত্রিকার কলাম কোথায় তিনি বিচরণ করতে বাদ রেখেছেন? সর্বত্রই তার পদচারণা ছিলো। ছিলো রাজনৈতিক সক্রিয়তা। যেকোন বিষয়ে তিনি তার প্রতিবাদী ভাষা লিখে জানাতে ভুল করেননি। আহমদ ছফা এমন একজন মানুষ, যিনি বাজার ধরার জন্য তার কলম চালাননি। কলম চালিয়েছেন ন্যায়ের পক্ষে, সমাজ সংস্কারে। তিনি তার কাজে সফল হয়েছেন। আজ এত বছর পরেও মানুষ তাকে গর্ব ভরে স্মরণ করে। সবাই গর্ব করে বলে- আমাদের একজন আহমদ ছফা ছিলো! এসব নিছক প্রশংসা নয়। ছফার কোয়ালিটি এটা। তার দুর্দান্ত সব গুণের বহিঃপ্রকাশের জন্যই মানুষ আজও তার শূন্যতা অনুভব করে। এ কারণেই কেউ কেউ হয়তো আজও বলে ওঠে- কোথায় পাবো আমরা প্রতিবাদী ছফার ন্যায় আরেকজন লেখক? মাঝেমধ্যে আমারও এই প্রশ্ন জাগে, কোথায় পাবো তাহারে? আর তাই, সময়ে অসময়ে স্মরণ করি প্রিয় লেখক ছফাকে। এইযে দু’চার কথা লিখি, এসব স্মৃতিচারণ প্রিয় আহমদ ছফার কর্মগুণেরই ফসল। তিনি শক্তিশালী। তিনি মানুষকে তাকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছেন বলতে হয়, এতটাই ক্ষমতাবান ছিলো তার লেখা।

আহমদ ছফা মারা গেছেন আজ বহু বছর হলো। কিন্তু তিনি মানুষের মন থেকে মারা যাননি। আর এত সহজে মারা যাবেনও না। তিনি যেসব আদর্শ নিয়ে কাজ করে গেছেন, তা দিনকে দিন বৃদ্ধি পেতেই থাকবে। তার উত্তরসূরীরা তাকে নিয়ে লিখবেন সীমাহীন। এই যেমন আমি লিখে ফেললাম তাকে নিবেদন করে অগোছালো মনের অগোছালো কিছু কথা। এ কেবল স্মৃতিচারণ, আহমদ ছফার বিস্তৃত কর্মপরিধি নিয়ে আলোচনা করার জন্য এমন ছোট্ট লেখা যথেষ্ট নয়। তবুও কিছু তো লিখতে পারলাম। আজ আর নয়। শেষ করতে চাই প্রিয় লেখক আহমদ ছফার বেশকিছু চমৎকার উক্তি দিয়ে-

“একটা মানুষের মধ্যেই গোঁজামিল থাকে। কিন্তু যে সাপ, সে হান্ড্রেড পারসেন্ট সাপ। যে শেয়াল, সে হান্ড্রেড পার্সেন্ট শেয়াল। মানুষ সাপও হইতে পারে, শেয়ালও হইতে পারে, পাখিও হইতে পারে। মানুষেরই বিভিন্ন চরিত্র নেয়ার ক্ষমতা আছে। বুঝছো, গ্রাম দেশে আগে সাপ আর শেয়াল পাওয়া যাইতো। এগুলা নাই এখন। কারণ সাপ, শেয়াল এরা মানুষ হিসাবে জন্মাইতে আরম্ভ করছে।”

– সাক্ষাৎকার (নাসির আলী মামুন নিয়েছিলেন)

“আমার পরিবার চাষা। আমার পক্ষে এটা ওভারলুক করা কষ্টকর, রঙ চড়িয়ে কিছু বলতে চাই না। আমার পূর্বপুরুষেরা সরাসরি কৃষি উৎপাদনের সাথে যুক্ত ছিল। এই পরিচয় আমার অহংকার।”

“লোকে যাই বলুক, যাই অনুভব করুক, নিজের কাছে আমি অনন্য।”

“সরলতা এবং সততাই আমার মূলধন।”

“নারীরা নারীই, সঙ্গের সাথী, দুঃখের বন্ধু এবং আদর্শের অনুসারী নয়।”

“কার্লাইল গ্যেটেকে মহাপুরুষ মুহাম্মদের চাইতেও বড়ো মনে করেছেন। আমার ধারণা তিনি ভুল করেছেন। কারণ হযরত মুহাম্মদ (সঃ) জীবনের স্বরুপ উপলব্ধি করে নিজস্ব মহিমায় স্থিত করেছেন। আর গ্যেটে শুধু জীবনের মহিমা কীর্তন করেছেন। Prophetic genious –এর সাথে Poetic genious-এর এখানেই তফাৎ।”

“বাংলাদেশের আসল বস্তু বলে যদি কিছু থাকে তা হলো- এর আমলাতান্ত্রিক কাঠামো। স্থবির, অনড়, লোভী, হৃদয়হীন এবং বিদেশী শক্তির ক্রীড়নক হওয়ার জন্যে সর্বক্ষণ প্রস্তুত।”

“বস্তুত একজন বিশ্বাসী মানুষ ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে যে ধরনের নির্মল আনন্দ অনুভব করেন, একজন ধর্মবিশ্বাসহীন মানুষ উন্নত সাহিত্য পাঠেও একই আনন্দ পেয়ে থাকেন।”

“যে জাতি উন্নত বিজ্ঞান, দর্শন এবং সংস্কৃতির স্রষ্টা হতে পারে না, অথবা সেগুলোকে উপযুক্ত মূল্য দিয়ে গ্রহণ করতে পারে না, তাঁকে দিয়ে উন্নত রাষ্ট্র সৃষ্টিও সম্ভব নয়।”

“বাঙালি মুসলমানের মন যে এখনও আদিম অবস্থায়, তা বাঙালি হওয়ার জন্যও নয় এবং মুসলমান হওয়ার জন্যও নয়। সুদীর্ঘকালব্যাপী একটি ঐতিহাসিক পদ্ধতির দরুণ তাঁর মনের উপর একটি গাঢ় মায়াজাল বিস্তৃত রয়েছে, সজ্ঞানে তাঁর বাইরে সে আসতে পারে না। তাই এক পা যদি এগিয়ে আসে, তিন পা পিছিয়ে যেতে হয়। মানসিক ভীতিই এই সমাজকে চালিয়ে থাকে।”


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *