পাপলু ভাই ও বাল্ডারল্যান্ডের জনৈক যুবক

প্ল্যানেট বাল্ডারল্যান্ডের একদল লোক রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। হাতে টেঁটা, বল্লম আর দড়ি। পাশেই একটা চায়ের দোকানে বসে আছেন পাপলু ভাই। এসব দেখতে দেখতে চা খাচ্ছেন তিনি। এত হৈ-হুল্লোড় আর অস্ত্রের বাহার দেখে অবাক হলেন একটু। তাই ঐ দলের একজনকে ডাক দিলেন ঘটনা জানার জন্য।

“এইযে ভাই, একটু এদিকে আসো তো।”

শুনে দলের এক যুবক এদিকসেদিক দিকে তাকাতে লাগলো। পাপলু ভাইয়ের দিকে চোখ পড়তেই তিনি বললেন-
“হ্যা, আমিই ডেকেছি। এদিকে আসো।”

ছেলেটা কাছে এগিয়ে আসলো। দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো।
“কী কইবেন কন? ম্যালা তাড়া আছে আমার।” বললো ছেলেটি।

পাপলু ভাই চোখের চশমাটা খুললেন। বললেন,
“তা ভায়া, আমার একটা প্রশ্ন ছিলো। এত দলবল নিয়ে তোমরা যাচ্ছো কোথায়? সবার হাতে এত অস্ত্র।”

“অস্ত্র নিয়া মানুষ কই যায় জানেন না?”

“কত জায়গায় ই তো যাওয়া যায়। তোমরা কোথায় যাচ্ছো?”

“ধুর মিয়া! আপনে দেহি কিছুই জানেন না।”

শুনে হাসলেন পাপলু ভাই। বললেন,
“আসলেই সত্যি। আমি খুব কমই জানি। তা হয়েছেটা কী শুনি?”

“দ্যাশে যুদ্ধ লাগসে, যুদ্ধ! আমরা তাই অস্ত্র নিয়া যুদ্ধে যাইতাসি। শত্রুপক্ষ রে মারার লাইগা এত লোক আর অস্ত্র।”

শুনে পাপলু ভাই ফের অবাক হয়ে গেলেন। এই দেশে সর্বশেষ যুদ্ধ হয়েছে বহু বছর আগে। পাশের বাসার পরকীয়া প্রেমিক, আর স্বামীর সাথেও তো তাদের সম্পর্ক ইদানীং ভালোই চলছে। গভর্নমেন্ট জনমতের দিক দিয়ে বিপাকে থাকলেও আউটার সাপোর্ট ভালোই মিলছে। তাই ক্ষমতায় এখনও টিকে আছে প্ল্যানেট বাল্ডারল্যান্ডের রফরফ পার্টি। তাহলে দেশে কিসের যুদ্ধ লাগলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেলেন না পাপলু ভাই। অগত্যা প্রশ্নটি ছুড়ে দিলেন ছেলেটিকে।

“তা দেশে কী নিয়ে যুদ্ধ লেগেছে? আর কোন জায়গায় লেগেছে? আমি জানি না। তুমি বলো তো ভাই শুনি!”

“আপনে মিয়া একখান লোকই! দ্যাশে কুত্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ লাগছে আপনে এইটা জানেন না? কুত্তার দল তাগো শতশত সৈনিক দিয়া আমগো শতশত শহরবাসীরে হত্যা করতাসে। থুক্কু কামড়াইয়া শ্যাষ করতাসে। কুত্তা সৈনিকগো লগে আমরা কিছুতেই পারতাসি না। হেইল্লিগা যুদ্ধে যাইতাসি। কুত্তা মাইরা আইজ তামা তামা কইরা ফেলমু!”

এ কথা শুনে পাপলু ভাই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। কুকুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ? এ আবার কোন সময়ে, কোন দেশে এলাম রে ভাই! যুদ্ধ তো হয় দেশের বিরুদ্ধে দেশের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের, মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের। প্ল্যানেট বাল্ডারল্যান্ড কি তাহলে সবকিছুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হয়ে “কুত্তা নিধন” যুদ্ধে লিপ্ত হলো? ভাবলেন তিনি। “একেবারে ননসেন্স কারবার!” মনে মনে বললেন। তারপর ছেলেটির দিকে তাকিয়ে কৌতুকের হাসি হেসে বললেন,
“আচ্ছা ভায়া, আর কী কী যুদ্ধ করো তোমরা বাল্ডারল্যান্ডের মানুষেরা?”

“ও মোর জ্বালা, আপনে হেইয়াও জানেন না? আমরা মশার বিরুদ্দে যুদ্য করি, শিয়ালের বিরুদ্দে যুদ্য করি, বেবাক ইসুতে ফেইসবুকেও যুদ্য করি। আমরা সবাই যোদ্ধা। না মানে ওয়ারিয়র বোঝসেন। এইযে এহন কয়টা কুত্তা মারুম। তারপর ফেসবুকে সেলপি দিমু। ব্যাপারডা কিউট না বাই? জমপেশ না?”

কথা শুনে পাপলু ভাইয়ের চোখ ছানাবড়া হবার জোগাড়। তবুও তিনি মুখে হাসি ধরে রাখলেন। এই হাসি ঠিক কোন অর্থে তা তিনি নিজেও বুঝতে পারলেন না। অতঃপর বললেন,
“বহত কিউট। জমপেশ। পুরাপুরি ট্যাশ। দারুণ কাজ করে চলেছো তোমরা। তা ভায়া, কুকুর তোমাদের কী ক্ষতি করেছে?”

শুনে যুবক হো হো করে হেসে উঠলো।
“এইডা কোন কতা কইলেন বাই? কুত্তায় বাইক এক্সিডেন্ট করায়। রাইতে কুত্তার চিল্লাচিল্লির জ্বালায় ঘুমাইতে পারি না আমরা। এমনকি পাশের বাসার মহিউদ্দিনের কুত্তার জ্বালায় অগো ঘর থেইকা মাল সামানা নিবার পারি না।”

“ঘর থেকে মাল সাবানা নিবা মানে?”
একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন পাপলু ভাই।

“ইয়ে মানে, গরে কত সামানা থাকে। ওইগুলা তো বাইরে আনতে অয়। কুত্তার চিল্লাচিল্লিতে আনতে পারি না।”

“বুঝলাম, তুমি তাহলে একটা ছিঁচকে চোর। কুকুর তোমাদের চুরিতে ডিস্টার্ব করে। তাই কুকুর মারতে হবে। আর রাস্তাঘাটে টাল্লি মেরে বাইক চালিয়ে এক্সিডেন্ট করলেই দোষটা কুকুরের। যত দোষ নন্দ ঘোষ। ভালোই।” মনে মনে ভাবলেন পাপলু ভাই। তারপর যুবকটিকে জিজ্ঞেস করলেন,
“আজকের পেপার দেখেছো?”

“না।”

“অহ। আজকে দশটি ধর্ষণ আর বড়সড় কয়েকটি দুর্নীতির নিউজ ছেপেছে। জানো?”

“নাহ। জানি না।”

“এখন তো জানলে। এসবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে কবে?”

“রাখেন তো আপনার ঘ্যানা প্যাঁচাল।” বিরক্তি নিয়ে বললো ছেলেটি। “গ্যালাম আমি। আগে কুত্তা মারা শ্যাষ হোক। সন্ধ্যায় পার্টি মিটিংয়ে বিরানি আছে। স্লোগান দিলেই বিরানি আর পাঁচশো ট্যাকা।”

বলেই চলে গেলো যুবক। পাপলু ভাই কিছু বললেন না, কেবল হাসলেন। মনে মনে ভাবলেন-
“এদেশে তোরাই সংখ্যায় বেশি। পাঁচশো টাকা আর বিরিয়ানি দিয়ে যে জাতির অধিকাংশ তরুণ কেনা যায়, তাদের দশা তো এমনই হবে। তোদেরকে আর কী বলার আছে? শিক্ষায় যারা শিক্ষিত হলো, তারাই নিশ্চুপ। নীরব। সুযোগ সন্ধানী। এদেশে বিপ্লব মানেই অপরাধ। দুর্নীতি করে মেনিবিড়াল হওয়াটাই আদর্শ। হায়রে আদর্শ! বস্তুবাদীর দল। বুঝলি না তোদের পাঁচশো টাকার ভিক্ষার আড়ালে পাঁচ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়, বিরিয়ানির আড়ালে পুরো দেশটাকেই খেতে দিস তোরা। তোরা, যাদেরকে এসব করার ক্ষমতা দিস, তোদের বিচার হওয়া উচিত আগে। হাজারো বেকার কাজে তোদেরকে মগ্ন রেখে ফায়দা লোটে সুবিধাবাদ কায়েম করা ভোগবাদীর দল। তোরা তা বুঝলি না।

ওরে মূর্খের দল, না বুঝিতে কাদেরকে তুই
ক্ষমতা দিলি বল?
কোন সে লোভে, করলি
সোনার দেশটারে রসাতল?”


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *