সাহিত্য, প্রকাশক, লেখক-পাঠক এবং সমকালীন ভাবনা

“নতুন লেখকরা ভালো লিখতে পারে না।”

“নতুন লেখকদের বই পড়া উচিত নয়।”

“নতুন লেখকদের বই পড়ে ফায়দা নেই।”

“নতুন লেখকরা একই বৃত্তে (প্রেম) আবদ্ধ থাকে।”

“নতুন লেখকরা লেখক নাকি! এরা সস্তা গল্প লেখে।”

থামুন এবার! অনেক বলেছেন। এবার নাহয় একটু চুপ থাকুন। চুপ করে শুনুন। লেখকদের নিয়ে কতগুলো অভিযোগ দাঁড় করান আপনারা। একচেটিয়া অভিযোগ যাকে বলে। মোটকথা, এখন লেখকদের নিয়ে অভিযোগ করার বিষয়টি একেবারেই কমন। লেখকদের নিয়ে বাজে মন্তব্য করলে জাতে ওঠা যায় একটু। আপনারা যারা এসব অভিযোগ করেন, তাদেরকে একটু বলতে চাই- রোজ কতজন লেখককে আপনারা প্রোমোট করেন? এদেশে কয়জন সম্ভাবনাময় তরুণ লিখতে এসে ভালো প্লাটফর্ম পায়? কয়জন একটু ধীরেসুস্থে লিখতে পারে? জবাব দিতে পারবেন? পারবেন না। আপনারাই বলেন, টাকার জন্য না লিখতে। টাকার জন্য লিখলে লেখা নষ্ট হয়। বেশ! ভালো কথা। আপনারা কি কখনো বিপরীত দিকটি চিন্তা করেছেন? একজন লেখক লিখতে গিয়ে যখন তার মাথায় রাজ্যের চিন্তা থাকে, পেটে ক্ষুধা থাকে, সে কিভাবে ভালো লিখতে সক্ষম হবে? তার সামনে যখন বাস্তবতার অন্ধকার, সেটা ডিঙিয়ে কিভাবে একজন লেখক আপনাদেরকে ভালো কনটেন্ট উপহার দেবে বলুন? তার স্বস্তির জায়গাটা রয়েছে? কোনো প্রকাশক কি একজন লেখককে শুরু থেকে প্লাটফর্মে দাঁড় করিয়ে রিল্যাক্সে লেখার মত অবস্থান গড়ে দেয়? একেবারেই দেয় না। একজন মানুষ শুরুতে লিখতে এলে কী হয়, তাহলে সেটা জানুন-

“আপনাকে পুরো টাকা দিতে হবে। নয়তো বই ছাপবো না আমরা। রিস্ক নিতে পারবো না। (কনটেন্ট যতই ভালো হোক, আপনি অপরিচিত)।”

“আপনাকে অর্ধেক বই কিনে নেবার গ্যারান্টি দিতে হবে। নয়তো আপনার বই ছেপে আমরা রিস্ক নিতে চাই না। (কনটেন্ট যতই ভালো হোক, আপনি অপরিচিত)।”

এখানে মূল বিষয়টি দেখুন- লেখক “অপরিচিত” এজন্য তার বই ছাপানো হবে না। কারণ কী? কারণ “ব্যবসা” হবে না। তাই কনটেন্ট ভালো নাকি মন্দ এটা কোন প্রকাশক দেখবে না। সবাই চায় পরিচিতি, যাতে ব্যবসা করা যায়। তার মানে লেখালেখি হোক কিংবা যেকোন ইন্ডাস্ট্রিতে “পরিচিতি” তথা জনপ্রিয়তা বড় একটা ফ্যাক্ট। জনপ্রিয়তা ব্যবসা করতে সাহায্য করে। জনপ্রিয়তা বই বিক্রি করে প্রকাশককে স্বাবলম্বী করে তোলে। এবার আসি আরেক প্রসঙ্গে। এখন জনপ্রিয়তা তৈরি করার জন্য কোনো লেখক যদি মার্কেটিং করে, তাহলে কিছু পাঠক সমালোচনার নামে সেসব লেখককে খামচে ধরে। বিষয়টি আরেকটু ক্লিয়ার করি। ধরুন- কেউ একটু গভীর লেখা পড়তে অভ্যস্ত। এই পাঠক চাইলেই কিন্তু পারে যাদের লেখায় গভীরতা আছে, এমন লেখকদের বই প্রোমোট করতে এবং বিপরীতে, হালক ধাঁচের লেখা এড়িয়ে যেতে। কিন্তু তিনি তা করবেন না! তিনি বরং হালকা ধাঁচের লেখা নিয়ে হাস্যরস করতে থাকবেন। জাতে ওঠার চেষ্টা করবেন। জনপ্রিয় কোনো লেখককে তুলোধুনো করার মাঝেই এই পাঠকের সার্থকতা। অথচ চাইলেই তার মত পাঠকের সময় কোন একজন ভালো লেখক তার প্রোমোশনে পেতে পারতো! পেলো না। এইযে ভালো লেখকদেরকে প্রোমোট না করে হালকা ধাঁচের গল্প লেখকদের ডিমোটিভেট করার প্রবণতা আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে চরমভাবে গেঁথে গেছে। হাস্যরসের আড়ালে গভীর লেখার লেখকরা হারিয়ে যায়। এজন্য বইয়ের ইন্ডাস্ট্রি আর এগোতে পারছে না। বাজার সয়লাব হালকা ধাঁচের বইয়ে। কারণ, ইতিবাচক হোক, নেতিবাচক হোক প্রোমোশন ওসব বইয়েরই হয়। এই ব্যাপারটা কিছু পাঠক ভুলে যান। হাস্যরস করতে গিয়ে তারা হালকা ধাঁচের বইগুলোরই মার্কেটিং করে দিয়ে যান। ওদিকে প্রোমোশনের অভাবে লাইমলাইট পায় না ভালো লেখাগুলো।

যাইহোক, ইন্ডাস্ট্রিকে এগিয়ে নিতে প্রকাশকের দায়িত্ব ছিলো-

১। কনটেন্ট দেখা।
২। প্লাটফর্ম গড়ে দেয়া।
৩। ভালো প্রোডাকশন তৈরি করে ব্যবসা করা এবং পাঠকদেরকে দুর্দান্ত সব বই উপহার দেয়া।
৪। মার্কেটিংয়ের পুরো দায়িত্ব নিজেদের টিমের কাঁধে নেয়া।

অথচ তারা এসব না করে দেখছেন “পরিচিতি” তথা ব্যবসা করার জন্য “জনপ্রিয়তা”। কারণ, লেখক জনপ্রিয় হলে ওপরের দায়িত্বগুলো থেকে প্রকাশক অব্যাহতি পান। রিস্ক নেয়া লাগে না তার। একটু কষ্ট করে ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরি করে নিতে হয় না। তাহলে লেখক কী করবে? (তারা তখন লেখায় মনোযোগী না হয়ে সোশ্যাল সাইটে গ্রুপিং করে, ভাই-ব্রাদার গ্যাঙ তৈরি করে, পেইড রিভিউয়ার, মার্কেটার রাখে সেলিব্রেটি হয়ে জনপ্রিয় হবার জন্য। তাহলেই, বই লেখা সহজ হয়ে যায়)।

সহজ ভাষায়- আগে সেলিব্রেটি-তারপর লেখালেখি। এটা করতে লেখক স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয় না, বরং পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়। আর আপনারা কিছু পাঠক আছেন, বইয়ের বিজ্ঞাপন দেখলেই জ্বলে ওঠেন তেলেবেগুনে। গ্রুপ খুললে, কেউ বই নিয়ে একটু বেশি বললেই আপনারা তাকে একহাত নিতে ছাড়েন না। সুশীল পাঠক তো। নতুন কেউ লিখতে আসলে তাকে পচানোর মধ্যে এস্থেটিক একটা ভাব তো আছে! ফেইসবুক সমাজে একটু ভাবসাব রক্ষা করা যায় এতে। এজন্যই আপনারা ভালো লেখার প্রচারের চাইতেও নতুন কাউকে পচানোর কাজটি খুব ভালোভাবেই করে থাকেন। আপনাদেরকে ধন্যবাদ। এবার ভালো একজন পাঠকের কাজ নিয়ে বলি। তাদের উচিত-

১। ভালো বই পড়া।
২। সকল বইয়ের রিভিউ করা সম্ভব নয়, যেসব বই অন্য পাঠকের পড়া উচিত বলে মনে করেন পাঠক, সেসব বই নিয়ে রিভিউ করা।
৩। লেখকদেরকে নিরুৎসাহিত করার চেয়ে, ভালো লেখকের প্রচারেই বেশি সময় দেয়া।

কিন্তু কয়জন পাঠক আজকাল এই কাজটি করেন? কয়জন আছেন, ভালো লেখা ছড়িয়ে দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত? কয়জন আছেন, যারা রোজ ভালো লেখকদেরকে প্রোমোট করে সামনে আনেন? (বরং উল্টো কাজটাই বেশি করে থাকে আজকালকার পাঠকেরা। কিছু পাঠক আবার রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, হুমায়ূন, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ আর সুনীল গোত্রের বাইরে আর কোন নতুন কালজয়ী লেখক আসুক সম্ভবত এটাই চান না। আর লেখক তরুণ হলে তো তাদের আরো সমস্যা! চোখের সামনে একজন তরুণের বড় হওয়া কয়জন মেনে নিতে পারে সেটা বাংলাদেশে থাকলেই বোঝা সম্ভব। ঈর্ষাই এদেশের জাতীয় গুণ)। এসব কারণে, এদেশে একটা লেখকশ্রেনী গড়ে উঠছে না ঠিকমতো।

এইতো গেলো প্রকাশক, পাঠকদের কথা। এবার লেখকদেরকে কিছু না বললেই নয়। অবশ্য এখন যেসব লেখকদেরকে নিয়ে বলবো, তাদেরকে আমি মূলত “লেখক বলতে রাজি নই”। এরা হচ্ছে-

১। দু’দিন ফেইসবুকে লিখে তিন দিনের সময় বই প্রকাশ করা ব্যক্তি।
২। তোষামোদ করা ব্যক্তি।
৩। আঁতেল ব্যক্তি।
৪। এ্যাটেনশন সিকার ব্যক্তি।

হ্যা পাঠক, আপনারা এদের কাছ থেকে দূরে থাকবেন। আর এদেরকে লেখক বলে মূলত যারা লেখক, তাদেরকে অপমানিত করবেন না। সত্যি বলতে, আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে নানা সমস্যা রয়েছে। এটাই চরম বাস্তবতা। রাজনৈতিক একটা প্রভাব তো আছেই। এমনকি দেশের মানুষের স্বভাবগত প্রভাবের কারণেও বইয়ের ইন্ডাস্ট্রির এই করুণ হাল। তাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে, করাতে হবে। বইয়ের সুদিন ফেরাতে হবে। তারপর কথা হবে উৎকৃষ্ট সাহিত্যমান নিয়ে। এদেশে এখন পর্যন্ত বিশাল পাঠকশ্রেনীই নেই। তাই মান বিচার করার সময় হিসেবে কমই উপযুক্ত বর্তমান সময়। তবে আপনারা বলবেন, অবশ্যই বলবেন বই নিয়ে। এক্ষেত্রে আমার পরামর্শ থাকবে- ভালো বইগুলো নিয়ে বলুন, নেতিবাচক সমালোচনা থেকে বিরত হয়ে। সময়টা এখন নেতিবাচক কিছুর কঠোর সমালোচনার চেয়ে ভালো কিছু আলোচনার জন্য সর্বোত্তম। চলুন তাহলে ভালো কিছু নিয়ে আলোচনা করি। নেতিবাচক বইগুলোকে তুখোড় সমালোচনায় বিদ্ধ করে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন নেই।

প্রকাশক ভাইয়েরা, আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি যা বললাম, সেটা সার্বজনীনভাবে ইন্ডাসট্রির কল্যাণের জন্য। ইন্ডাস্ট্রির কল্যাণ মানেই আপনাদের কল্যাণ। ইন্ডাস্ট্রি বাঁচলে আমরা বাঁচবো। আপনারা বাঁচবেন। তাই চলুন বইয়ের ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচাতে এবার উদ্যোগ নেই। আপনারা সবাই-

কনটেন্ট দেখুন। প্লাটফর্ম তৈরি করুন। মার্কেটিং খাত শক্ত করুন এবং রিস্ক নিন। সর্বোপরি ভালো প্রোডাকশন বাজারে আনুন। পরিচিত করান। দেখবেন, ব্যবসা হবেই হবে। সেইসাথে পাঠক পাবে ভালো সব বই।

প্রিয় পাঠকেরা, আপনারাও আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি “সুপাঠক” এবং “কুপাঠক” এর তফাৎ তুলে ধরেছি। আপনারা যারা ভালো পাঠক আছেন, তারা আরো পাঠক তৈরি করবেন জানি। এই প্রত্যাশাই রইলো সবার কাছে। অনুরোধ থাকবে আপনারা সবাই-

ভালো বইগুলো নিয়ে আলোচনা করবেন। নেতিবাচক বই নিয়ে সমালোচনা করবেন, তবে সেটা যেন ভালো বইয়ের আলোচনা থেকে পরিমাণে কম হয়। আর সমালোচনা গঠনমূলক করতে চেষ্টা করবেন। যাতে লেখক শিখতে পারে, নিজেকে শোধরাতে পারে। নিশ্চিত থাকুন, তবেই ভালো বই পাবেন অনেক বেশি। সন্তুষ্ট হবেন ওসব বই পড়ে।

প্রিয় লেখকরা, আপনারাও আমাকে ভুল বুঝবেন না। আপনাদেরকে বেশিকিছু বলার নেই। কেবল এতটুকু বলবো-

গ্রুপিং করার চেয়ে লেখার কনটেন্টে মনোযোগ দিন। তাহলে একদিন ঠিক কালজয়ী হতে পারবেন। নয়তো ব্যবসা করতে পারবেন ঠিকই, কিন্তু মেরুদন্ডহীন হয়ে যাবেন। নিজের নামটা হারিয়ে যাবে কালের আবর্তনে। এখন নিজেরাই ঠিক করুন, কী করবেন?

সর্বোপরি, সবার সম্মিলিত চেষ্টা হোক সাহিত্যকে এগিয়ে নেবার জন্য। আর হ্যা সবার উদ্দেশ্যে আরেকটি কথা বলবো- কোন লেখককেই বিবেচনা করার ক্ষেত্রে “নতুন লেখক” বিশেষণ টানবেন না। এটা বলা মাত্রই আপনি বিশ্লেষণ থেকে হারিয়ে গিয়ে ভুল করে বসলেন! কারণ, লেখক কখনো “নতুন-পুরাতন” হয় না। লেখক হয় শুধুই লেখক।


Posted

in

by

Tags:

Comments

3 responses to “সাহিত্য, প্রকাশক, লেখক-পাঠক এবং সমকালীন ভাবনা”

  1. মোহাম্মদ ইব্রাহীম Avatar
    মোহাম্মদ ইব্রাহীম

    পুরো লেখাটা পড়লাম, ভাই। লেখাটা কতটা ভালো ছিলো, সেটা আশা করি না বললেও চলবে। যারা পড়বেন বুঝতে পারবেন আশা করি।
    ভাইয়া, লেখাটায় সবগুলো বিষয় তুলে ধরেছেন। সব প্রেক্ষাপট নিয়ে বলেছেন। ইন্ডাস্ট্রির বেশ কিছু বিষয়ে জানতে পারলাম যা সম্পর্কে আগে ধারনা ছিলোনা।
    সবশেষে এটাই বলতে পারি, আর কিছু না হোক অন্তত ভালো পাঠক হয়ে লেখক ও প্রকাশকের পাশে থাকবো ইনশাআল্লাহ।
    জাযাকাল্লাহ খাইরান ।

  2. Mim Ahmec Avatar
    Mim Ahmec

    কথাগুলো এক্কেবারে সত্য বলেছেন

  3. শেহজাদ আমান Avatar
    শেহজাদ আমান

    ভালো লেখনি হয়েছে। পাঠক, লেখক ও প্রকাশক- তিনটা গোষ্ঠির কাজ ও দায়িত্ব নিয়ে সুন্দর আলোকপাত করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *