গ্রামে বসবাস ভালো লাগার পেছনে কতিপয় কারণ

গ্রাম সবারই পছন্দ। শহুরে কোলাহলময় জীবন অনেকের কাছেই বিরক্তিকর। কাজের সুবাদে হয়তো অনেক লোকই শহরে বসবাস করে থাকে। কিন্তু দিনশেষে মন পড়ে থাকে গ্রামের খোলা প্রান্তরে, যেখানে পাখিরা গান গায়, নদী বয়ে যায় এবং প্রকৃতির স্নিগ্ধ মায়া জড়িয়ে থাকে। কাজের ফুরসত মিললেই তাই লোকে গ্রামে চলে যায় একটু প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে। কিন্তু এ তো সাময়িক সময়ের জন্য। চলুন তাহলে স্থায়ীভাবে গ্রামে বসবাস করার পেছনে মানুষের ভালো লাগার দিকগুলো আজ একটু অন্বেষণ করি ছোট্ট এই লেখায়।

পশ্চিমা বিশ্বেও অধিকাংশ মানুষই শহরে বসবাস করে থাকে। ইএসএ এর সেন্সাস ব্যূরোর জরিপ মতে, আমেরিকার নাগরিকদের মধ্যে ৮০% ভাগ লোকই শহরে বসবাস করে। এর পেছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে। উন্নত জীবনব্যবস্থা, নানারকম সুবিধাসহ বিনোদনের খোরাক পেতে যাবতীয় জিনিসের সমাহার রয়েছে শহরে।

যাইহোক, এতসব সুবিধার বিপরীতে শহরে বেশকিছু অসুবিধাও রয়েছে। বায়ু দূষণ, অতিরিক্ত যানবাহন, অপরাধের বাড়তি হারসহ নানা কারণে মানুষ গ্রামে বসবাসের জন্য ছুটে যায়। এগুলোর বাইরে আরো কিছু কারণ রয়েছে সেসবই আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু।

গ্রামাঞ্চলে দূর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে

গ্রামে লেন এবং গাড়ির সংখ্যা কম থাকে। তার ওপর রাস্তার পার্শ্ববর্তী গাছের অবস্থানসহ নানাবিধ কারণে দূর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা খুব কম থাকে। এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের একটা জরিপের কথা বলা যাক। বেকার ল অফিস কতৃক পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, কেন্টাকিতে যত কার এ্যাক্সিডেন্ট হয়, তার ৬৪% ভাগই হয় শহরাঞ্চলে। এর বাইরে গিয়ে গ্রামাঞ্চলে কমই দূর্ঘটনা ঘটে। তাছাড়া গ্রামের রাস্তায় গাড়ি চালানোর বিষয়টি বেশ উপভোগ্য। কেননা, আশেপাশের নৈসর্গিক দৃশ্যের দেখা মেলে খুব ভালোভাবেই।

অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য দেখার সুযোগ কেবল গ্রামেই রয়েছে

কেউ যদি শহরে থেকে থাকেন এবং চারদিকে তাকিয়ে বিলবোর্ড আর ফ্ল্যাশ লাইটের আলোয় বিরক্ত হয়ে থাকেন তাহলে তার জন্য এটাই উপযুক্ত সময় গ্রামে ফিরে যাবার জন্য। গ্রামের মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি তার জীবনে অন্যরকম সজীবতা এনে দেবে। উঁচুনিচু পাহাড়, বয়ে চলা নদী, সারি সারি গাছ নিশ্চয়ই মনকে ভালো করার জন্য সবচাইতে উত্তম পরিবেশ।

গ্রামে অপরাধের হার অনেক কম

মানুষের গ্রামে বসবাস করার অন্যতম কারণ হচ্ছে এখানে অপরাধের হার একেবারেই কম। রাজনৈতিক দিক দিয়ে শহরের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব কম হওয়ায় এখানে অপরাধ তেমন সংঘটিত হয় না। তাছাড়া গ্রামের মানুষ খুব সহজ সরল। ফলে খুব বেশি ঝামেলা চোখে পড়ে না সচরাচর। মাঝেমধ্যে গুরুতর কিছু অপরাধ যদিও সংঘটিত হয়, তবে সেই হারটা খুবই কম। ফলে নির্ঝঞ্জাট এক জীবনের জন্য গ্রাম আদর্শ স্থান।

নির্মল বাতাস উপভোগের সেরা জায়গা

আপনি যদি শহরে বসবাস করে থাকেন, তাহলে আমি নিশ্চিত সবচাইতে যে বিষয়টি আপনি মিস করে থাকেন তা হলো- নির্মল বাতাস। শহরের যান্ত্রিক পরিবেশে বায়ু দূষণের মাত্রা এতটাই বেশি যে নির্মল বাতাসে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেয়ার ব্যাপারটি একরকম অসম্ভব! বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে সারা বিশ্বের শহরাঞ্চলের প্রায় ৮০% ভাগ অঞ্চলে বায়ু দূষণ ব্যাপক আকারে হয়ে থাকে। কিন্তু গ্রামে আপনি সহজেই খোলামেলা সবুজ প্রান্তরে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে স্বস্তি দিতে পারবেন।

মনে সজীবতার রেশ পাওয়ার জন্য গ্রাম সবচাইতে উত্তম জায়গা

মনে করুন, আপনি কোন গাছের নিচে বসে আছেন। শীতল বাতাস আপনাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। কেমন লাগবে আপনার? অথবা ধরুন আপনি কোন সবুজ ঘাসের প্রান্তরে শুয়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে আকাশ দেখছেন কিংবা নদীর পাড়ে বসে চারপাশের মনকাড়া দৃশ্য দেখছেন। ধারণা করুন কেমন হতে পারে আপনার অনুভূতি? কোনদিন নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দু’হাত প্রসারিত করে লম্বা নিঃশ্বাস নেয়া হয়েছে? না হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নিন। মনে সজীবতা আসতে একটুও সময় লাগবে না!

শান্ত, স্থিতিশীল জীবন পেতে গ্রামই উত্তম

আপনি যদি শহর থেকে গ্রামে ফিরে যান, তখনও আপনার কাজ করতেই হবে। কেননা, আগের মতই আপনার পরিবার পরিজন এবং সন্তান সন্ততি সবই থাকবে। কিন্তু এটুকু আশা করতেই পারেন- গ্রামে আপনার জীবন এতটাও ব্যস্ত ও গতিশীল হবে না যে আপনি সুখ হারিয়ে ফেলবেন জীবন থেকে। তুলনামূলক নীরবতার মাঝে আপনার কাজ করতেও ভালো লাগবে। স্থিতিশীল জীবন আপনাকে দেবে মানসিক প্রশান্তি।

ট্রাফিক জ্যাম থেকে মুক্তি

শহুরে জীবনে সবচাইতে বিরক্তিকর একটা ব্যাপার হচ্ছে ট্রাফিক জ্যাম।এতে শুধু ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেকে সময় নষ্টই হয় না, বরং বিরক্তির মাত্রাও সীমা ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু গ্রামের চিত্র ঠিক তার বিপরীত। এখানে গাড়ি চলাচলের সংখ্যা কম। যার ফলে ট্রাফিক জ্যামের মত বাজে অবস্থায় কাউকে পড়তে হয় না। মাঝেমধ্যে যদি ট্রাফিক জ্যাম দেখাও যায়, তবে সেটা খুবই কম। এতই কম যে তা আমলে নেবার মত কিছু নয়।

লম্বা আয়ুষ্কালের জীবন পেতে গ্রামে বসবাসের জুড়ি নেই

এটা সত্য যে শহরের মানুষ নিজের শরীরে শক্তি জোগানোর জন্য নানারকম খাবার এবং চিকিৎসাও পেয়ে থাকে। কিন্তু প্রাকৃতিক ও ঘরোয়া পরিবেশে তৈরি খাবার, নিজের জন্য নিজে তৈরি করা ডিশসহ নানা সতেজ খাদ্য গ্রহণ করতে পারার মধ্যে যে শক্তি রয়েছে, সেটা নিশ্চয়ই কৃত্রিমতা দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই এদিক দিয়েও গ্রামে বসবাসের বেশ ফায়দা রয়েছে।

স্বল্প ব্যয়ে সুন্দর জীবনযাপন

শহরের তুলনায় গ্রামে কম খরচে ভালো অবস্থায় জীবন পার করা সম্ভব। বাড়িভাড়া, খাবারের ব্যয় ছাড়াও আনুষাঙ্গিক যত খরচ রয়েছে শহরের তুলনায় গ্রামে সেই খরচের খাত অনেক কম। তাছাড়া সবকিছু তুলনামূলক কম খরচে পাওয়া সম্ভব। তাই ব্যয় কম করেও সুন্দর জীবন পাওয়া সম্ভব গ্রামে বসবাসের মাধ্যমে।

সরল মানুষের সন্ধ্যান

শহুরে রুক্ষ মানসিকতার মানুষের বিপরীতে গ্রামে সরল মানুষের দেখা পাওয়া সম্ভব। তাদের সাথে মিশে ভালো সময় কাটানো যায়। গ্রামের মানুষ এতটাই সরল যে, অনেক সময় তাদের আশপাশ দিয়ে দুরন্ত গতিতে কোন গাড়ি ছুটে গেলেও তারা স্বাগতম জানাতে ভুল করে না।

শান্তি এবং নীরবতা পেতে হলে গ্রামে বসবাস করাটাই শ্রেয়

গ্রামে খোলামেলা মাঠে রয়েছে খেলার ব্যবস্থা। মন ভালো রাখতে খেলাধুলার বিকল্প নেই। খেলাধুলা না করলেও বসে থাকতে পারেন নীরবতায়। সকল কাজকর্ম সেরে এসে মাঠের নীরবতায় বসলে যে কারোই ভালো লাগবে। মনে প্রশান্তি আসবে। অন্তত গাড়ির সাইরেন, যান্ত্রিক ঘটঘট শব্দ থেকে মুক্তি পেয়ে এক মুহূর্তের জন্য হলেও নিজের জীবনের মানে খুঁজতে পারবেন নীরবতায় বসে। এছাড়াও শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন, সকালের নাস্তা করতে পারবেন। নিশ্চয়ই এতেও শান্তি মিলবে খুব।

আজ এই পর্যন্তই। কে কে গ্রামে বসবাস করেন? গ্রাম নিয়ে কার কী অনুভূতি? জানাতে পারেন আমাকে এবং পরবর্তী কোন লেখা প্রকাশিত হবার আগ পর্যন্ত সবাই ভালো থাকুন। হ্যাপি রিডিং।


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *