দর্শনগত বিরোধ এবং কিছু টুকরো কথা

[লেখাটি ‘ক্রাউড ফান্ডিং’ এর আওতাভুক্ত। পড়ার পর ভালো লাগলে কেউ যদি আমাকে সম্মানী দিতে চান, তাহলে ইনবক্সে নক করতে পারেন। মনে রাখবেন, লেখাটা পড়লেই সম্মানী দিতে হবে এমন নয়। পড়লেই টাকা দেয়া বাধ্যতামূলক নয়।]

লেখালেখি মানেই চিন্তাভাবনা ভাগাভাগি করা। কোন মানুষ যখন তার নির্দিষ্ট অবস্থানে দেশ, সমাজ ও ব্যক্তি জীবন পর্যবেক্ষণ করে, তখন তার অনেক কিছুই বলার মত থাকতে পারে। হতে পারে সেটা ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক। সত্যি বলতে চিন্তাভাবনাগুলো ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই শ্রেনীরই হয়। আর এই শ্রেনীবিভাগের মধ্যে কোন লেখক কোন প্রকারের আওতাভুক্ত হবেন (ইতিবাচক/নেতিবাচক) এবং কোন ধরণের চিন্তা প্রসব করবেন সেটা নির্ভর করবে উক্ত লেখক তার ব্যক্তিজীবনে কেমন আদর্শের ওপর অটল রয়েছেন কিংবা ব্যক্তি হিসেবে তিনি কেমন, সেটার ওপর। তার ব্যক্তিজীবনে ধারণকৃত আদর্শ থেকেই উক্ত লেখক সকলকিছু বিচার বিশ্লেষণ করে মানবসমাজে প্রচলিত বিভিন্ন বিষয়ের ওপর মতামত শেয়ার করবেন এটাই স্বাভাবিক। এই আদর্শ/বিশ্বাসের ধরণ দর্শনভেদে হতে পারে বহু শ্রেনীর। তবে অবিশ্বাস/বিশ্বাস অনুসারে সচরাচর দুই ধরণের দর্শন প্রচলিত আছে আমাদের সমাজে। সেই দর্শনের ছাঁচে মানুষ জীবনকে দেখে, সমস্যা সমাধানে বার্তা দেয়। প্রতিবাদ করে নানা বিষয়ে। লেখক একজন মানুষ। মানবসমাজের অংশ বিধায়, তিনি নিজেও বহুল প্রচলিত এই দুই ধরণের দর্শনের অন্তর্ভুক্ত। এই দুই দর্শন হচ্ছে- আস্তিকতা ও নাস্তিকতা। এই দুটো দর্শনের দুইটি পরস্পরবিরোধী রাস্তা রয়েছে। মানবজাতির সবার শরীরে একই লাল রঙের রক্ত বইলেও, তারাও হাঁটতে থাকে দুটি পরস্পর বিরোধী দর্শনের সড়কেই। এগুলোর মধ্যে পুরোপুরি বিশ্বাস নির্ভর আস্তিকতা চলে গেছে সরল পথে। তাদের কতিপয় মূল ভাবনা হচ্ছেঃ

১। মুসাফিরের মত জীবন।
২। দুনিয়ার চাকচিক্য ভুলে যতটা সম্ভব মানবকল্যাণে নিয়োজিত হওয়া।
৩। নিজেকে অতি তুচ্ছ করে প্রভুর নিকট আত্মসমর্পণ করে তার ভালোবাসা অর্জন।
৪। দুনিয়ার জীবনকে তারা মূল্য দেয় না(বস্তুবাদী দিক থেকে)। মানবিক দিক থেকে প্রচুর মূল্য দেয়। ফলে প্রকৃত আদর্শবাদী ব্যক্তিমাত্রই নিজের জীবন বাজি রেখে পরোপকারে লিপ্ত থাকে।

(নোটঃ নাস্তিকরা আস্তিকদের দুনিয়াকে মূল্যহীন মনে করার এই অবস্থাকে ‘হতাশাজনক’ বাহুল্যতা বলে উড়িয়ে দিয়ে থাকে বস্তুগত চিন্তা থেকে। কিন্তু তারা ভুলে যায়, মস্তিষ্কগত দিক থেকে নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে করাটা সবচাইতে হচ্ছে বড় আধুনিকতা এবং অসাধারণত্বের নিদর্শন। কারণ, এই মানুষগুলো হয় বিনয়ী, পরোপকারী এবং সহজেই নিজের ভুল বুঝতে পারা ব্যক্তি। এমনকি নিজের জন্য দু’মুঠো খাবারের পর বাকি অংশটাও তারা নিজেদের জন্য না রেখে বিলিয়ে দেয়। কারণ, মৃত্যু আসন্ন। সঞ্চয় একটা মোহমাত্র।)

অন্যদিকে, বিপরীত দিকের দর্শন হচ্ছে নাস্তিকতা। তারা বস্তুবাদে বিশ্বাসী। সবকিছুই তারা বিচার করে বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে। তারই প্রমাণ ওপরে ব্র্যাকেটে দেয়া অংশ মনোযোগ সহকারে পড়লেই বোঝা যায়। নাস্তিকরা দুনিয়াকে খুব মূল্যবান মনে করে (বস্তুবাদী অর্থে)। ভোগবাদী চিন্তার এই মানুষগুলো বিশ্বাস করে মৃত্যুর পর আর কিছুই নেই। নেই ফিরে আসার দ্বিতীয় কোন সুযোগ। ফলে তারা ইচ্ছেমত জীবনকে উপভোগ করে। যতটা সম্ভব নিজের জীবনকে আনন্দ দেয়। যেহেতু, তাদের দর্শনমতে পরকাল বলে কিচ্ছু নেই, সেহেতু পাপ পূণ্যের কোন বালাই থাকা অনাবশ্যক। ফলে ‘যা ইচ্ছে তা করবো’ এই মনোভাব তৈরি হয় এই দর্শনের অধিকাংশ অনুসারীর মাঝেই। তারই প্রতিফলন ঘটে তাদের পুঁজিবাদী মানসিকতায়। টাকাই যার মূল অস্ত্র। এখানে আরেকটু যোগ করে দেই- আস্তিকতা ও নাস্তিকতা পরস্পরবিরোধী দর্শন হবার কারণে আস্তিকতা কখনোই পুঁজিবাদী চিন্তাকে সমর্থন করে না। একজন আস্তিক (ইসলামের কথাই বলি, যেহেতু আস্তিক মাত্রই ধর্মে বিশ্বাসী) কখনোই যাচ্ছেতাই কাজ করতে পারে না। প্রচন্ড নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নির্দিষ্ট সীমারেখার বাইরে আজেবাজে জিনিসেও টাকা ঢেলে ব্যবসা চালানোর মত কাজ ইসলামে দারুণমাত্রায় নিষিদ্ধ। অর্থাৎ, ইসলামে দুনিয়াবী এবং পরকালীন কল্যাণই সব। ব্যবসার ক্ষেত্রেই বা এই ধারা কেন বাদ যাবে? বাদ যায় না। সবকিছুকেই আদর্শের কঠিন মাপকাঠিতে মেপে মুসলিমদেরকে চলতে হয় (আমি ইসলাম ও মুসলিমদের উদাহরণ দিলাম কারণ আস্তিকদের উদাহরণ টানতে হলে আমাকে কোন না কোন ধর্মের উদাহরণ দিতেই হত। সেক্ষেত্রে নাস্তিকদের প্রধান বিরোধী দল ইসলামের উদাহরণই দিলাম)। ফের চলে যাই নাস্তিকতার প্রসঙ্গে। তাদের মূল ভাবনাগুলো হচ্ছে-

১। সর্বোচ্চ উপভোগের জীবন (যেহেতু মৃত্যুর পর কিচ্ছু নেই- এই বিশ্বাস তাদের)।
২। তারাও মানবকল্যাণে কাজ করে, তবে সেটা ব্যক্তিভেদে ওঠানামা করে। মোটের ওপর, পুঁজিবাদী চিন্তায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের আয়ের ব্যবস্থা আসলে অনৈতিক উৎস অথবা সাধারণ মানুষের রক্ত চুষে আসে। আপনি কাউকে ইচ্ছেমত পেটালেন, তারপর তাকে ওষুধ কিনে দিলেন, আখেরে এ কেমন মানবকল্যাণ? বিশাল রেঞ্জের ক্ষতি করে পুঁজিবাদী কর্পোরেট ব্যক্তিবর্গ। সেই অর্থে তাদের মানবকল্যাণের বিস্তৃতির হারই বা কতটুকু? একেবারেই কম।
৩। তারা কোন স্রষ্টায় বিশ্বাস করে না। তাদের নিজস্ব যোগ্যতার ওপর নিজেদেরই অহংকার উপস্থিত। কেননা, স্রষ্টা নামের কিছুর ভাগ নেই তাদের কোন কর্মে এমনটাই তাদের বিশ্বাস।
৪। দুনিয়ার জীবনকে তারা খুব মূল্য দেয়(বস্তুবাদী দিক থেকে)।

মূলত এগুলোই হচ্ছে আস্তিকতা ও নাস্তিকতার দর্শনের ক্ষুদ্র কিছু তফাৎ। বিস্তারিত আলোচনা খুব সময়সাপেক্ষ। সে হিসেবে এইটুকু পড়লেই যেকোন পাঠক মোটামুটি ধারণা পাবেন। এবার আসি লেখক প্রসঙ্গে। একজন লেখকের কাছ থেকে আপনি তেমন লেখাই পাবেন, ব্যক্তি জীবনে যেমন দর্শন উক্ত লেখক লালন করেন। ওপরে সীমিত আকারে দুটি দর্শনের পার্থক্য আমি তুলে ধরেছি। এই দুটি দর্শনের যেকোন একটি ধারণ করেন লেখকগণ। প্রতিটি লেখকেরই নিজস্ব উদ্দেশ্য থাকে, কেউ আবার বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করে। মোটামুটি এরও কয়েকটি শ্রেনীবিভাগ করা যায়- কেউ লেখে টাকার জন্য, কেউ খ্যাতি পেতে, কেউ নির্দিষ্ট কোন দল বা মতের এজেন্ডা বাস্তবায়নে, কেউবা আবার সমাজের বাস্তবিক অবস্থান থেকে আদর্শকে প্রচারের লক্ষ্যে। একেবারে শেষ কাতারের লেখকদেরকেই সমাজের জন্য উপকারী বলতে পারেন বিস্তৃত অর্থে। বাকিরা কেউ ভাঁড়ামি করে, চিন্তার ডাইভারশনকে অস্বীকার করে আমোদপ্রিয় কুয়োর ব্যাঙের মত পাঠক সমাজ গড়ে তুলতে কাজ করে। আখেরে এসব লেখক টাকা আয় করাকেই প্রাধান্য দেয়। চিন্তাশীল পাঠক যারা রয়েছেন, তারা লেখকদের কর্মকান্ড, লেখার বিষয় ও লেখকের স্বভাবে এসবের ছাপ দেখে বুঝতে পারবেন। এসব দেখার মাধ্যমেই সত্যিকারার্থেই কোন লেখক আদর্শবান, কার লেখা পড়া উচিত এমন একটি সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারেন। একজন প্রকৃত লেখক তার ক্ষুরধার চিন্তা শেয়ার করার মাধ্যমে এমন সব পাঠক তৈরি করেন যারা নিজেরাই যেকোন বিষয়ে কলম ধরতে সক্ষম। যেকোন বিষয়ের প্রতিবাদ করতে বা চিন্তার গভীরতা দেখাতে সক্ষম। এরকম পাঠক তৈরি করতে না পারলে, একজন লেখকের স্বার্থকতা আসলে কোথায়? কোন লেখকের দ্বারা একপাল ভাঁড় উৎপন্ন করা হলে জাতির তাতে ফায়দা কী? আদৌ কি সমাজ গঠনে অমন লেখকের কোন প্রভাব আছে? কে দেবে এই প্রশ্নের জবাব?

বিঃদ্রঃ এতকিছুর বাইরেও ব্যতিক্রম কিছু মানুষ রয়েছে। কিন্তু কথা বলার জন্য ব্যতিক্রম কোনকিছুই উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে ধরা হয় না।


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *