যুদ্ধ ও মানুষ

‘যতক্ষণ আমি না আসবো, তুমি এখানেই বসে থাকবে। ঠিক আছে?’
‘আমার ভয় লাগছে বাবা।’
‘ভয় পেয়ো না। আমি দ্রুতই ফিরে আসবো, লক্ষী ছেলে আমার।’
এই বলেই উঠে দাঁড়ায় আব্দুল্লাহ।
‘খুব ভয় লাগছে বাবা।’
মাথা নিচু করে বলে নাভেদ। ছেলের কথা শুনে আব্দুল্লাহ ফের হাঁটুগেড়ে নিচু হয়ে বসে। ডান হাতে ছেলের থুতনি উঁচু করে বলে,
‘কোনো ভয় নেই। আমি আছি তো। চুপ করে বসে থাকো। আমি বাইরের অবস্থা দেখে আসি, সোনা মানিক আমার।’
নাভেদ হ্যা সূচক মাথা ঝাকায়। ফের মৃদু হাসে আব্দুল্লাহ। তারপর ছোট্ট ছেলের কপালে চুমু খেয়ে ভাঙা দেয়ালের আড়াল থেকে বের হয়ে গেছে প্রায়, অমনি নাভেদ ডেকে ওঠে,
‘বাবা!’
আব্দুল্লাহ পেছন ফিরে তাকায়। ছেলের দিকে তাকিয়ে তার হাবভাব বোঝার চেষ্টা করে।
‘কী হলো নাভেদ?’
নাভেদ মনে মনে কী যেন ভাবে। তারপর বলে,
‘কিছু না বাবা।’
আব্দুল্লাহ মৃদু হেসে বলে, ‘আসি। এত ভয় পেয়ো না। আর আমি না আসা পর্যন্ত এখান থেকে বাইরে বের হবে না। মনে থাকে যেন।’
বলেই আব্দুল্লাহ বাইরে বেরিয়ে পড়ে ভাঙা দেয়াল ছেড়ে। নাভেদ দেয়ালের এক কোণায় ঘাপটি মেরে থাকে।

ওপরে নীল আকাশে তপ্ত রোদ। ভর দুপুরে সূর্যের তাপে যেন সব পুড়ে যাবে। দু’পাশের ভবনের গলি দিয়ে সামনের দিকে এগোতে থাকে আব্দুল্লাহ। রাস্তার মাঝে ইট, পাথর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আরো আছে ঘরদোরের ভাঙা আসবাব। চারদিক সুনসান। কোথাও কোন মানুষের চিহ্ন নেই, থাকার কথাও না। একটু আগেই এখানে বিমান হামলা চালিয়েছে আমেরিকান সৈন্যরা। তাদের লক্ষ্যবস্তু ছিলো আর্শওয়ার শহর দখল করে থাকা আইএস সৈন্যরা। কিন্তু সেইসাথে সাধারণ মানুষগুলোও তাদের আক্রমণের বলি হয়েছে। কিছুদিন আগেও এই জনপদ কোলাহলে মুখরিত ছিলো। হাসি আনন্দে চলছিলো সব। বাচ্চারা স্কুলে যেত, ব্যবসায়ীরা করত ব্যবসা। মসজিদে আযান হত, মানুষ নামাজ পড়তো, অন্যান্য ধর্মের মানুষরা তাদের মত করে ব্যস্ত থাকতো স্রষ্টার প্রার্থণায়। সুন্দরভাবেই কাটছিলো সবার দিন। কিন্তু বেশিদিন তা বজায় থাকলো না। তাদের সুখের কপালে নেমে এলো দূঃখ, দুর্দশা। শান্তিময় জীবনে নেমে এলো অভিশাপ। একদিন হঠাৎ কালো পোশাকে সজ্জিত, মুখোশ পরিহিত লোকদেরকে গাড়ি নিয়ে দলে দলে শহরে প্রবেশ করতে দেখা গেলো। সমস্ত শহরটি তারা হঠাৎ দখল নিয়ে নিলো। শহরের সর্বত্র পাহারা বসালো। বাড়িঘর, বিদ্যালয় এবং হাসপাতাল ছাড়াও আরো যত প্রতিষ্ঠান ছিলো সব জায়গায় তাদের লাল পতাকার নিশান উড়িয়ে দিলো। কারো বুঝতে বাকি রইলো না যে, এরা ইসলামিক স্টেইট গ্রুপের জঙ্গীদল। যাদের কাজই হলো মানুষকে অযথা হত্যা করে ইসলামের আড়ালে এক সন্ত্রাসী জগত কায়েম করা। আর্শওয়ার শহর দখল সেই কুকর্মেরই একটি পদক্ষেপ। ধীরে ধীরে তারা জনগণের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন শুরু করলো। তাদের ভয় দেখিয়ে নানা সন্ত্রাসী কাজে পাঠাতে লাগলো। যদি কেউ তাদের অবাধ্য হত, তাহলে ওই লোকের শিরশ্ছেদ করা হত। এসব কোন খবরই আর চাপা থাকে না। একদিন বহির্বিশ্বের কাছে পৌছে যায়। ইসলামিক স্টেটের জঙ্গীদের অবস্থান সনাক্ত করে ফেলে বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো, সিদ্ধান্ত নেয় সেখানে আক্রমণ করার। অনেকেই এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, কেননা এতে অসংখ্য সাধারণ মানুষও মারা যাবে। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো তাতে কোন কর্ণপাত করেনি। আইএস হটাতে আক্রমণ করা ছিলো অপরিহার্য বিষয়। তাই নির্ধারিত সময়ে আকাশপথে আক্রমণ চালায় আমেরিকান জেট বিমানগুলো। একের পর এক ধ্বংস হতে থাকে দালানকোঠা, ঘরবাড়ি। ধ্বংস হয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর উপাসনালয়গুলো। জঙ্গীদের সাথে মারা যায় অগণিত নিরীহ মানুষ।

আব্দুল্লাহ এখন সেই মৃত মানুষের শহরের ধ্বংসাবশেষের ওপর দিয়ে হাঁটছে। শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে অবস্থান করায় বেঁচে গেছে সে ও তার দশ বছর বয়সী ছেলে নাভেদ। দুজন মিলে আশ্রয় নিয়েছে ভাঙা দেয়ালের পেছনে। ছোট্ট নাভেদ ভয়ে কাঁপছিলো, আব্দুল্লাহর কপাল জুড়ে ঘাম নামছিলো যুদ্ধের ভয়াবহ অবস্থা চিন্তা করে। তুমুল যুদ্ধ হয়েছিলো এতক্ষণ। চারিদিক থেকে গোলাগুলির আওয়াজ আসছিলো বজ্রপাতের মত। উপায় না পেয়ে বেশ খানিকটা দূরে ছেলেকে নিয়ে লুকিয়ে ছিলো আব্দুল্লাহ। এখন পরিবেশ শান্ত, কোথাও গোলাগুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না। তাই যুদ্ধের অবস্থা এবং বেরোবার পথ জানার জন্যই নাভেদকে লুকিয়ে রেখে বাইরে বেরিয়ে আসে সে। গলি পার হয়ে প্রধান সড়কে যেতেই হতবাক হয়ে যায় আব্দুল্লাহ। আশেপাশে মানুষের লাশ ছড়িয়ে আছে। কারো হাত নেই, কারো আবার পা। কারো আবার মাথাটা জখম হয়ে আছে বীভৎসভাবে। রক্তমাখা জামায় টকটকে লাল রক্ত, এখনো চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। এসব দেখে আব্দুল্লাহর হাত পা অবশ হয়ে আসে, শরীর ভেঙে পড়তে চায়, পেট গুলিয়ে আসে। সে আর সহ্য করতে পারে না। চোখ বন্ধ করে সামনের দিকে এগোয়। ধুলাবালি মাখা তার মুখখানিতে হতাশা ও মর্মান্তিক যন্ত্রনা ফুটে ওঠে। কিছুদূর এগোতেই একটা শিশুর লাশ চোখে পরে তার। ছোট্ট ফুলের মত মেয়ে। চুলগুলোতে ধুলা লেপ্টে আছে। সুন্দর ফর্সা মুখটায় রক্তের ছোপছোপ দাগ। যেন শান্তিতে ঘুমোচ্ছে! আর সহ্য করতে পারে না আব্দুল্লাহ। ধপাস করে মাটিতে বসে পড়ে। তার চোখ দিয়ে অবাধে জল গড়াতে থাকে। কী অপরাধ এই মানুষগুলোর? কী অপরাধ এই শিশুটির? ভেবে পায় না সে। জঙ্গী দমনের নামে এত এত নিরীহ মানুষের লাশের দায় কে নেবে? জীবনটাকে বড় তুচ্ছ মনে হয় তার। জন্মাও, গুলি খাও আর মরে যাও। এখানকার কি অদ্ভুত নিয়ম! এই নিয়মের বেড়াজাল ভেঙে কেউ বাঁচতে পারেনি। কিন্তু আব্দুল্লাহ এখনো বেঁচে আছে। হয়ত ভাগ্য সহায় ছিলো তার। নিজের মাঝে হঠাৎ এক ধরণের শক্তি অনুভব করে সে। এভাবে আর নয়, বহির্বিশ্বকে অবহিত করতে হবে যে, সন্ত্রাসীরা মুসলিম নয়, তাদের কোন ধর্ম নেই। আরো জানাতে হবে, ওপর থেকে হামলা করে জঙ্গী নিধনের নামে নির্বিচারে সাধারণ মানুষ হত্যা করা কোন সঠিক পথ নয়। এটা বন্ধ করে বিকল্প পথ খুজে নিতে হবে, স্থলপথে লড়তে হবে সন্ত্রাসীদের সাথে। মানুষজনদের সরিয়ে নিতে হবে যুদ্ধস্থল হতে। তবেই মানুষ বাঁচবে, মরবে সন্ত্রাসী, জন্ম হবে নতুন এক দেশের, নতুন দিনের। আব্দুল্লাহ শিশুটির দিকে তাকায়। তার চুলে হাত বুলিয়ে কপালে চুমু খেয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। পায়ে জোর নেই তার, কিঞ্চিৎ আঘাত পেয়েছিলো সে। তাই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে থাকে, খানিকবাদেই পৌছে যায় নাভেদের কাছে। বাবাকে দেখেই নাভেদ দৌড়ে এসে জাপটে ধরে কাঁদতে থাকে। তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে মৃদু হাসে আব্দুল্লাহ। যুদ্ধের তোড়জোড় নেই আপাতত, এখান থেকে সরে পড়বার এখনি উত্তম সময়। ছেলেকে কাঁধে নিয়ে আব্দুল্লাহ রওনা হয় সীমান্তের দিকে, দূরে খুব দূরে যেখানে আলেয়ার রেখা ভাসছে, ফের মিলিয়ে যাচ্ছে।

(সমাপ্ত)


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *