বড় স্বপ্ন দেখুন, বিকল্প উপায় খুঁজুন | সফল উদ্যোক্তা

একটি সফল বাণিজ্যের বিষয়টি প্রায়ই বৃহৎ সুযোগের ওপর নির্ভর করে থাকে। হতে পারে সেটি আসবে বিশেষ কিছুর আবিষ্কার থেকে। আমি মনে করি বৃহৎ কোনো সুযোগের বিশ্লেষণ এবং সেখান থেকে সুবিধা আদায় করে নেবার বিষয়টি আসলেই খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি করার পর পরিশ্রমের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে বৃহৎ ব্যবসা। বিষয়টি বোঝার সুবিধার্থে আমি ভি জি সিদ্ধার্থের উদাহরণ দিচ্ছি।

সিদ্ধার্থের পরিবার কর্ণাটকের চিকমাগুলুরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করে আসছিলো। সিদ্ধার্থ ব্যাঙ্গালোরে কমার্স নিয়ে পড়াশোনা করেছে এবং মিজৌরের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাস্টার্স কোর্স করার সময় মাঝপথে পড়াশোনা থামিয়ে মুম্বাই চলে আসে। সেখানে সে স্টক ব্যবসা শুরু করে পারিবারিক কফির ব্যবসা বাদ দিয়ে এবং বৃহৎ পরিসরে টাকা বিনিয়োগ করতে শুরু করে। একসময় সে তার পারিবারিক ব্যবসায় ফিরে যায়। কিন্তু কোনোভাবেই সে সুখী হচ্ছিলো না তাদের ছোট্ট ব্যবসা নিয়ে। সে আরো বড় কিছু করতে চাচ্ছিলো। অতঃপর বছরের পর বছর পরিশ্রম করে তার কফি চাষাবাদের জমি কয়েকশো একর থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দশ হাজার একরে গিয়ে দাঁড়ালো! এই বৃদ্ধির পেছনে তার নিজের শ্রম ও আকাঙ্ক্ষার অবদান থাকলেও, গতানুগতিক কফি চাষীরা কফির কম দাম নিয়ে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলেন, এটাও ভূমিকা রেখেছিলো। অনেক কফি এস্টেট তখন বিক্রি হয়ে যাচ্ছিলো। বাকিসব শষ্যের মতই কফি চাষও ছিলো ব্যাপক পরিশ্রমের কাজ। সারা বছর যত্ন নিতে হতো। সেচ দিতে হতো এবং অবশ্যই সঠিক সময়ে বারবার। এমনকি পশুপাখিদের থেকে রক্ষা করতে হতো। এত এত পরিশ্রমের পর কৃষক যখন ফসল পেত, তারপর তাদেরকে কফির বাজার সম্পর্কে ধারণা রাখতে হতো, ছোটাছুটি করতে হতো। কিন্তু আফসোসের বিষয়, দেখা যেত কেউ খরচের মূল্যেও কফি কিনতে চাইতো না। এভাবে এই চক্রটা এতটাই অভেদ্য হয়ে গিয়েছিলো যে অনেক চাষীরাই কফি চাষ ছেড়ে দিলো।

এস্টেটের পর এস্টেট বন্ধ হয়ে যেতে লাগলো। এ্যান এল নিনো, হাজার মাইল দূরে বসে ইন্ডিয়ায় কফি চাষাবাদের ভবিষ্যত বলে দিতে সক্ষম ছিলো। সিদ্ধার্থ ঠিক এই সময়ে বন্ধ হতে যাওয়া এস্টেটগুলো মালিকদের কাছ থেকে কিনতে শুরু করে।

একইসাথে সিদ্ধার্থ অসহায় বোধ করছিলো। এমন একটি ব্যবসা কেউ কিভাবে চালিয়ে যেতে পারে যেখানে পণ্যের মূল্য পাওয়া যায় না? কফি ব্যবসার গোড়ার খবর জানার পর তার হতাশা আরো বেড়ে গেলো। আনুমানিক সারা বিশ্বে প্রতিবছর ১২০ মিলিয়ন ব্যাগের মত কফি উৎপাদন হয়। এই শষ্যের আনুমানিক মূল্য ৭ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু একই পরিমাণ শষ্য যখন কফি হয়ে আপনার কাপে এসে যায়, তখন এই অঙ্কটা বেড়ে দাঁড়ায় ১০০ বিলিয়ন ডলারে! কৃষক তার পণ্যের ন্যায্য দাম পায় না এবং দাম নিয়ে টানাহেঁচড়াও চলে, কিন্তু বিশ্বের কোথাও এক কাপ কফির মূল্য নিয়ে কখনোই কোনোরকম দরদাম হয় না। আপনি ততটাই দিতে বাধ্য যতটা কাউন্টারে থাকা লোক আপনার কাছ থেকে দাবী করবে। কাজেই, কফি চাষ যে দাম দিতে না পারে, এক মগ কফি সেই দান দিতে সক্ষম।

সিদ্ধার্থ ভাবলো যে এ্যাল নিনো এবং আন্তর্জাতিক কফি কার্টেলের পরিবর্তে, ৭ বিলিয়নের সমস্যা দূর করার চেয়ে ১০০ বিলিয়ন ডলারের আয়কে ক্রস করাটাই উত্তম। তাই সে তার এডাভার্টাইজিং এজেন্সিকে ডাকলো এবং তারা আসলো। কিন্তু তারা তাকে কফি বিক্রি করতে সমর্থন দিলো না। তারা বললো, এই মুহূর্তে কফি মার্কেট বছরে শতকরা মাত্র ২% ভাগ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অগত্যা সাউথ ইন্ডিয়ার এই পরিবারটি কফি নিজেদের বাড়িতে মজুদ করে রেখে দিলো। সিদ্ধার্থের মতে, কফির বাজার যথেষ্ট ভালো ছিলো না।

অগত্যা সে বিকল্প চিন্তা বের করলো। শহর ও গ্রামের তরুণদের মধ্যে যারা কফি পান করে তাদের জন্য কফি তৈরি করতে লাগলো। সে তাদেরকে এমন একটা পরিবেশ দিতে চাইলো যেখানে তারা শান্তিমত কফি পান করতে পারবে, গান শুনতে ও দেখতে পাবে এবং সাথে একটি স্যান্ডউইচ নিয়ে আড্ডা জমাতে সক্ষম হবে। এছাড়াও তাদের শান্তিতে মেইল চেক করতে পারবে কফির মগে চুমুক দিতে দিতে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৩ সালে ক্যাফে কফি শপ যাত্রা শুরু করে এই ট্যাগলাইন নিয়ে- ‘এক কাপ কফির চুমুকে হতে পারে অনেক কিছুই।’ আজকে পুরো ইন্ডিয়ার ৬৫টি শহর ও গ্রাম জুড়ে এই ক্যাফে কফির ৩০২টি আউটলেট রয়েছে৷ ঘরোয়াভাবে কফি পানের বিষয়টি যখন অচলপ্রায়, সিদ্ধার্থ সেই সময়ে কফিকে একটা লাইফস্টাইল ড্রিংকস হিসেবে দেখেছিলো। সাধারণ ছোট্ট একটি দোকান থেকে অতঃপর জন্ম হয়েছিলো ‘ক্যাফে কফি’ নামক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের। এটাকেই আমি বড়সড় ভাবনার চিত্রাঙ্কন বলি।

বইঃ সফল উদ্যোক্তা
অনুবাদঃ ত্বাইরান আবির


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *