স্মোক ফ্যান্টাসি | থমাস আর জর্ডান

ঘড়ির কাঁটা রাত একটা ছুঁয়েছে। স্যান্ডারসন এখনো ওর নতুন গল্পটা লিখে চলেছে। শূন্য বাড়িতে পড়ার ঘরের বাতিটা জ্বলছে কেবল। মধ্যরাতে রাজত্ব করার অপেক্ষায় লাইব্রেরীর কোণে জমে আছে একগুচ্ছ আঁধার।

স্যান্ডারসনের কল্পনাশক্তিতে কিছু একটা হয়েছে। গল্পের মধ্যে চরিত্রের ভূমিকা বর্ণনা করতে আগে কখনও ওকে বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু এখন ওর এই ব্যাপারে সমস্যা হচ্ছে। এই যেমন- এই মুহূর্তে সে ওর গল্পের প্রধান চরিত্রটিকে নিষ্ঠুর, উচ্ছৃঙ্খল, কঠিন হৃদয়ের অধিকারী, কলুষিত আত্মার এক মানুষ হিসেবে দাঁড় করাতে চাচ্ছে, কিন্তু পারছে না। চরিত্রটির চেহারা আর গঠন নির্মাণে বিফল হচ্ছে বারবার। ওর মনের চোখে সবকিছু কেমন যেন ঘোলাটে লাগছে।

পূর্বেও এ ধরণের অনেক গল্প লিখেছে সে। তাই হয়তো নতুন চরিত্র নির্মাণ আর বর্ণনা দেবার মত কিছু তার মাথায় আসছে না। ওর লেখা গল্পগুলো সবসময়ই অদ্ভুত আর রহস্যময় ধরণের। গল্পের চরিত্রগুলোও নির্মিত হয় ভয়ঙ্কর ক্ষমতাবান পুরুষ ও নারীদের নিয়ে। স্যান্ডারসন এবার বিচিত্র রকমের ভাবনায় পড়ে গেলো। পাঠকরা তার গল্পের চরিত্র সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা লাভ করতে পারবে, তেমন চমৎকার শব্দচয়ন করার কৌশল সম্ভবত সে ভুলে গেছে। যদি তাই হয়ে থাকে, যে কোনো মূল্যেই হোক তাকে পুনরায় সেসব নিজের মাঝে সঞ্চার করতে হবে।

হেঁটে জানালার কাছে গেল সে। তারপর খানিকটা উৎসাহ পেতে বাইরের দিকে তাকালো। গভীর রাত। মুষলধারে বৃষ্টি ঝড়ছে। এসব দেখে ওর কল্পিত উপযুক্ত চরিত্র নির্মাণে তেমন কোন লাভ হলো না। উল্টো রাতের আঁধার ওকে উপহাস করলো যেন। ছাঁইদানি থেকে ওর সিগারেটের ধোঁয়া ঘরের এক কোণে পড়ে কুন্ডলী পাকিয়ে উঠলো। স্যান্ডারসন একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকালো। ভাবলো, এখান থেকেই হয়তো সে তার লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারবে। যদি এমন হয় যে ওর কাঙ্খিত চরিত্রটি ধোঁয়ার মাঝে অবস্থান করছে, তাহলে ভেবেচিন্তে কল্পনার রঙ মিশিয়ে সেখান থেকে চরিত্র নির্মাণ করতে সক্ষম হবে সে, যেমন করে লোকে বাতাসের মাঝে ভাসমান মেঘে রাজপ্রাসাদ কল্পনা করে।

স্যান্ডারসন নিজের চেয়ার বসলো। তারপর তাকালো ধোঁয়ার কুন্ডলীর দিকে। ওর অগোছালো, রুক্ষ চুলগুলো জীর্ণ এক পাক ধোঁয়ার মতো দেখাচ্ছে, যেন তা কোন কুয়াশার ভেতর থেকে বের হয়ে এসেছে। এমন অবস্থায় দেখতে তাকে পাগলের মতো লাগবে। চুলের এক অংশ আরেক অংশ থেকে এমনভাবে আলাদা হয়ে আছে যে, অন্ধকারেও তা চকচক করে উঠছে। আর হাত পা ওয়ালা কোন প্রাণীর আকৃতি হিসেবে নিজেকে কল্পনা করতেও কষ্টের মনে হচ্ছে না। কিন্তু ধোঁয়ার কুন্ডলী থেকে ভয়ানক মুখাবয়ব আর দেহ কল্পনা করা খুব কঠিন। ব্যর্থ হয়ে মুখাবয়ব আর বর্ণনা তৈরিতে ধোঁয়ার ছুটে চলা ওপরের অংশের দিকে তাকালো সে। হঠাৎ ওর চেষ্টা সফলতায় রূপ নিলো।

সে ঠাওর করলো, ধোঁয়ার মাঝে একজোড়া বন্য, জ্বলন্ত চোখ ওর দিকে তাকিয়ে আছে। কুৎসিত নাক দৃশ্যমান হবার আগ পর্যন্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হতে লাগলো চারপাশ। আকাঙ্ক্ষিত ভয়ানক চরিত্রটির দেহটি পুরোপুরি দৃশ্যমান হবার সাথে সাথেই এটির চেহারাও উন্মুক্ত হতে শুরু করলো। স্যান্ডারসনের কাছে ওটাকে লম্বা, কঙ্কালসার কিন্তু শক্তিধর ভুতুড়ে বিড়াল মনে হলো। জন্তুটা চেয়ারে বসে প্রবল আক্রোশে তাকিয়ে আছে, যেন এক্ষুণি কামড় বসানোর জন্য প্রস্তুত। লম্বা একটি হাত চেয়ারের নিচে ঝুলে আছে, আরেক হাতে চেয়ারের হাতল ধরে আছে বসার ভারসাম্য রক্ষার জন্য। স্যান্ডারসন একদৃষ্টিতে জন্তুটার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে ওটা উঠে দাঁড়িয়েছে। মুখটা ভয়ানকভাবে হা করে তার দিকে তাকিয়ে আছে আড়চোখে। ভয়ে ওর মুখের এক পাশ থেকে চামড়ায় ভাজ পড়তে শুরু করেছে। কপালেও তেমনি ভাজের রেখা স্পষ্ট, আর চোখগুলো অস্বাভাবিকভাবে ফুলে গেলো। স্ফীত দৃষ্টি নিয়ে জন্তুটির দিকে তাকিয়ে রইলো সে।

সবমিলিয়ে কল্পনাটা বেশ চমৎকার ছিলো। শব্দচয়ন আর বর্ণনা দেবার জন্য স্যান্ডারসন কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল। নিজের ভেতর আত্মবিশ্বাসের ঢেউয়ের তরঙ্গ অনুভব করছে সে। গল্পের চরিত্রটা দারুণ! এবার নিজের কল্পনাশক্তি আর নব আত্মবিশ্বাসে গল্পটা এগিয়ে নিতে পারবে। স্বপ্নটা এখনো আছে কিনা এটা বোঝার জন্য স্যান্ডারসন চোখ খুললো। দেখলো, জন্তুটি পূর্বের ন্যায় চেয়ারে বসে আছে! আগের চেয়ে এটিকে আরো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। অবাক হয়ে গেলো স্যান্ডারসন। ওর মনে হলো, জন্তুটির মুখ দিয়ে যেন ঘৃণার নিঃসরণ হচ্ছে। ভয় পেয়ে গেল সে রীতিমতো। ওর মনে হচ্ছে পাগল হয়ে গেছে সে। জন্তুটির দেহাবয়ব আরো বড় হচ্ছে। ধোঁয়ার কুন্ডলী দেহের সাথে যুক্ত আছে এখনও। এক পর্যায়ে তা জ্যান্তরূপে স্যান্ডারসনের চোখে ধরা দিলো। এবং দ্রুতগতিতে ওর দিকে এগিয়ে এলো।

সবকিছু এত দ্রুত ঘটে গেলো যে স্যান্ডারসন চেয়ার থেকে ওঠার সময় পেলো না। জন্তুটি ওর ওপরে এসে পড়লো। লম্বা হাতে ওর গলা চেপে ধরলো। দম বন্ধ হয়ে আসছে ওর। প্রবলভাবে শক্ত হাতটি ছাড়াবার চেষ্টা করল স্যান্ডারসন, কিন্তু পারলো না। ভয়ঙ্কর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে জন্তুটি।

চোখে আঁধার দেখছে স্যান্ডারসন। ব্যথায় জ্ঞান হারানোর আগে ছাঁইদানি থেকে উঠে আসা সিগারেটের গন্ধটাই কেবল ওর মস্তিষ্ক ধারণ করতে পারলো।

(সমাপ্ত)


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *