বিস্মৃতির এক রাত

আজো প্রায় রাতেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায় জুবায়ের। হাঁটতে থাকে নিরুদ্দেশ। কখনো শানবাঁধানো ঘাটের দিকে, কখনোবা বালি দিয়ে ভরাট করা মাঠে। মাঝেমাঝে গাঁয়ের মাটির রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকে, যতক্ষণ না মন সায় দেয় ঘরে ফেরার জন্য। রাতের বেলায় তখন চারিদিক নিস্তব্ধ থাকে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে সবাই। পাতা পড়ার শব্দ ভেসে আসে, রাত জাগা পাখির ডাক শোনা যায়। আরো শোনা যায় রাস্তার পাশে ঘাসের আড়ালে ছোট প্রাণীর নড়াচড়ার শব্দ। আকাশে চাঁদ হাসে। থালার মত রূপালি বড়সড় এক চাঁদ। খানিকবাদে বাদে তা ঢেকে যায় কালো মেঘের আড়ালে। কিছুক্ষণ পর উঁকি দেয়, আবার ঢেকে যায়। ঠিক যেন জীবনের মত। জীবনে দূঃখের কালো মেঘ আসে, আনন্দ মুছে যায়, হাসি হারিয়ে যায়। ফের সুখ এসে উঁকি মারে কিছুক্ষণের জন্য, আবারো দূঃখের আড়ালে হারাবার জন্য। জুবায়েরের জীবনও তেমনই। সে একাকী হাঁটে। রাতের সৌন্দর্য্য তার সঙ্গী হয়। কথা বলে প্রকৃতির সাথে। মনে জমাট কষ্টগুলো তখন হালকা হয়। বহুদূরে চাঁদের আলোয় একটা ঘর চকচক করে। জুবায়ের ওটার নাম দেয় ‘স্বপ্নবাড়ী’। সে বিশ্বাস করে, স্বপ্নবাড়ীতে স্বপ্নগুলো পূরণ হয়। ওখানে নেই কোনো স্বপ্ন ভাঙার ইতিহাস, নেই বুকফাটা কোনো আর্তনাদের কাহিনী। জুবায়েরের বড় শখ একদিন ‘স্বপ্নবাড়ী’ যাবে!

অমাবস্যার রাত। নিকষ কালো আঁধারে ছেঁয়ে গেছে চারিদিক। সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সবাই। জুবায়ের কাঁথা গায়ে ঘুমিয়েছে অনেকক্ষণ হলো। গভীর ঘুমে বিভোর সে। ঘরময় আঁধার। ঘুমানোর জন্য আঁধার বেশ উপযোগী। ঘরে কেবল একটা হারিকেন জ্বলছে। জলচৌকির ওপর কিছু অংশ ব্যতীত সমস্ত ঘর অন্ধকারাচ্ছন্ন। হঠাৎ টিনের চালায় একটা শব্দ হয়। গাছের ডাল পড়ার শব্দ। জুবায়েরের ঘুম ভেঙে যায়। কয়েকবার আড়মোড়া ভেঙে ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে সে। দু’হাতে চোখ ডলে। ঘুম ঘুম ভাবটা চলে যায়। হারিকেনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে কী যেন ভাবে, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস নেয়। হাত বাড়িয়ে বালিশের পাশে থাকা চশমাটা নিয়ে গ্লাস দুটোতে ফুঁ মেরে পরিধান করে। হারিকেনের আলো নিঁভু নিঁভু করছে। বোধহয় তেল ফুরিয়ে এসেছে। স্যান্ডেল পরে দরজার কাছে যায় জুবায়ের। দরজা খোলে। বাইরে ঘুটঘুটে আঁধার। আজ আর ঘুম হবেনা। শুধু হাঁটাহাঁটি করবে সে। তবে বেশিদূর যেতে পারবেনা। প্রচন্ড অন্ধকারে রাস্তাঘাট কিছুই দেখা যাচ্ছেনা। তবুও বেরিয়ে পড়ে জুবায়ের। কিছুদূর যাবার পর হোঁচট খায়। ব্যথায় কুঁকিয়ে ওঠে। উঠে দাঁড়িয়ে হাত-পা ঝেড়ে নেয়। হাঁটা শুরু করে আবার। জুবায়ের কম কথা বলে। গাঁয়ের কারো সাথে তেমন কথা হয়না তার। মা,বাবা আর ছোট্ট মেয়েটি নিয়ে তার সংসার। তারা সবাই অন্য গ্রামে বাস করে। নাম রায়পুর। আর পাশেই এই বদলগাছী গ্রামে পাটখড়ির ছোট্ট বেড়ার ঘরে জুবায়ের একা থাকে।কাজ করে, সন্ধ্যায় বাড়ী ফেরে। খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। কোনো এক ভরপুর বসন্তে তার জীবনে অশনি অধ্যায় ঠাঁই নেয়। এরপর আর সুখে আসেনি।

আঁধারের গভীরতায় জুবায়ের রাস্তা ঠাওর করতে পারেনা। কেমন যেন সব অচেনা লাগে। অন্যসব রাতগুলোতে চাঁদের আলোয় সে হেঁটে বেড়ায়। চলে যায় দূর থেকে বহুদূর। কোনো অসুবিধা হয়না। কিন্তু আজ হচ্ছে। এভাবে চলা সম্ভব নয়। কাছেই শানবাঁধানো ঘাট। ঘাটের দিকেই পা বাড়ায় জুবায়ের। সিঁড়ির পাকা করা জায়গার ওপর সে বসে। তাকিয়ে থাকে পুকুরের জলরাশির দিকে। আঁধারে সবকিছু অস্পষ্ট লাগে। এই জলে একদিন জুবায়ের স্বপ্ন বুনতো। প্রেয়সী পা ডুবাবে, দুজনে জলকেলি করবে। সময় যায়, পুকুর থাকে, স্বপ্ন সত্যি হয়না। দখিণা বাতাস বইছে। বাতাসের ঝাপটায় শরীর শীতল হয়ে আসে। খুব ভালো লাগে জুবায়েরের। সে নিশ্চুপ। নীরবতা তার ভুষণ। বাকশক্তি অচল। সচল শুধু ভাবনাগুলো। স্মৃতিগুলো নিয়ে ভাবতে ভাবতে তার জীবন কাটে। সে এক জীবন বটে!

অনেকক্ষণ হয়েছে জুবায়ের বসে আছে। গভীর রাত। তবুও জুবায়েরের চোখে ঘুম নেই। বসে বসে কত কি ভাবছে! সুখ-দূঃখ,পাওয়া না পাওয়ার হিসেব মিলাচ্ছে। হঠাৎ বাতাসে একটা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসে। জুবায়েরের ঘ্রানশক্তি সহজেই তা বুঝতে পারে। নাক টেনে সে সুবাস নিতে চেষ্টা করে। অদ্ভুত এক সুবাস! ধীরে ধীরে জায়গাটা অচেনা সুবাসে ভরে ওঠে। জুবায়ের কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে যায়। চোখ বন্ধ হয়ে আসে তার। চোখ মেলতেই অপর পাশে রিতুকে বসা দেখতে পায় সে। নিজের চোখকে বিশ্বাস হয়না তার! আবছা আলোয় সবকিছু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। বিস্ফোরিত নেত্রে তাকিয়ে থাকে জুবায়ের। যা দেখছে ভুল দেখছে নাতো! দু’চোখ ডলে নেয় সে। আবার তাকায়। নাহ্, একদম ই না। সত্যিই রিতু বসে আছে। মুখখানি বেশ মলীন। বিষন্ন ভাব। তাকিয়ে আছে জলের দিকে। জুবায়ের অবাক হয়। কথা বলতে ইচ্ছে হয় তার। আনমনে জিজ্ঞেস করে,
‘তুমি এখানে?’
রিতু নিশ্চুপ। একদৃষ্টিতে জলের দিকেই তাকিয়ে আছে। জুবায়ের ফের বলে,
‘শুনতে পাচ্ছো?’
‘হুম।’
জবাব দেয় রিতু। দৃষ্টি জলের দিকেই নিবদ্ধ।
‘এখানে কি করছো?’
‘তোমায় দেখতে এসেছি।’
বিষন্ন গলায় জবাব দেয় রিতু।
‘আমি ভালো আছি। দেখতেই পাচ্ছো।’
‘কিন্তু আমি ভালো নেই।’
‘কেন!’
একটা দীর্ঘশ্বাস নেয় রিতু। বলে,
‘তুমি নেই বলে।’
‘আমি তো আছি। দিব্যি বেঁচে আছি জীবন্মৃত।’
‘এটা কি আমার দোষ?’
‘এভাবে বলছো কেন? দোষ আমাদের অদৃষ্টের। তুমিও কষ্টে আছো নিশ্চয়।’
‘খুব কষ্টে আছি। তুমি আমার সাথে যাবে?’

ধরা গলায় বলে রিতু। জুবায়েরের মুখের দিকে তাকায় না। জলের দিকে তাকিয়েই কথা বলছে। জুবায়ের জিজ্ঞেস করে,
‘কোথায়?’
‘যেখানে আমি আছি।’
জবাব দেয় রিতু।
‘ওখানে সব আছে। সুখ,সৌন্দর্য্য আর ঐশ্বর্য্য। এসব যথেষ্ট নয়কি?
‘না,যথেষ্ট নয়!’

রাগী গলায় বলে রিতু। জুবায়েদ একটা দীর্ঘশ্বাস নেয়। হাহাকারে বুকটা ভরে ওঠে।
‘তাহলে?’
‘ওখানে সব আছে। কিন্তু তুমি নেই। আমি অপেক্ষায় আছি কবে তুমি আসবে।’

জুবায়ের শব্দ করে হাসে। সেই হাসিতে রিতু চিনচিনে ব্যথা অনুভব করে।

‘সেটা সম্ভব নয় রিতু। আমার পরিবার আছে। আর মিতু তো আমাকে ছাড়া থাকতেই পারবেনা। একদম তোমার মত। যা মিষ্টি হয়েছে দেখতে বুঝলে! ঠিক যেন তোমার জমজ।’

রিতু নিশ্চুপ। কোনো কথা বলেনা। জুবায়ের বলে চলে,

‘এটা বিধির লিখন। আমি তা ভাঙতে পারবোনা। পাপিষ্ঠ হয়ে তোমার কাছে আসতে চাইনা, চাইনা আমার প্রস্থানে সবার মন কষ্টে ভাসুক। তুমি বরং কিছুকাল অপেক্ষা করো। তারপর আমি মেঘ হবো, আকাশে ভেসে বেড়াবো। তুমি তখন সহজেই আমাকে ছুঁতে পারবে।’

তবুও নিশ্চুপ রিতু। কথা বলেনা। কেবল একটা ফোঁপানীর আওয়াজ ভেসে আসে। হঠাৎ অদ্ভুত এক আলো রিতুর চেহারায় পড়ে। জুবায়ের স্পষ্ট দেখতে পায় তার প্রেয়সীর মুখটি। অশ্রুতে আঁখি ছলছল। রিতু কাঁদছে। জুবায়েরের বুকের পাথর গলে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। শূন্যতায় বুকটা ভরে যায়। বুকের ভেতর জমা কষ্ট দলা পাকিয়ে গলার কাছে আটকে যায়। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে তার। এই সেই রিতু, যার চোখের জল মাটিতে পড়ার আগেই ধরে ফেলতো জুবায়ের। মুছে দিতো ভেজা চোখ। আজ তার চোখের সামনে রিতু কাঁদছে। অথচ কিছুই করার নেই। রিতু তার জীবন থেকে চলে গেছে। দূরে, বহুদূরে। ততটা দূরে, যতটা দূরে গেলে কাউকে বুকে জড়ানো যায়না, মোছা যায়না চোখের জল, ছোঁয়া যায়না অস্তিত্ব। কান্নাজড়িত কন্ঠে রিতু বলে, ‘ভালো থেকো। আমি অপেক্ষা করবো। অপেক্ষা করবো ততদিন যতদিন না পৃথিবী ধ্বংস হয়। অপেক্ষা করবো তোমার মৃত্যু পর্যন্ত। অপেক্ষা করবো তোমাকে পাবার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। মিতুকে দেখে রেখো। ওর মাঝেই আমাকে খুজে নিও। চলি।’

বলেই হাওয়ায় মিলিয়ে যায় রিতু। বিস্ফোরিত নেত্রে জুবায়ের তাকিয়ে আছে। বসার জায়গাটা শূন্য। কেউ নেই ওখানে। বাতাসে আর মিষ্টি গন্ধটা ভাসছে না। জুবায়েরের মনে সংশয় জমে। কোথায় রিতু! এতক্ষণ তার সামনে বসে কে কথা বলছিলো! সত্যিই কি রিতু এসেছিলো? নাকি শুধুই স্মৃতিভ্রম? মাথা ঝিমঝিম করে। রীতিমত ভয় পেয়ে যায় জুবায়ের। মৃত মানুষের ফিরে আসার এই হিসাব মেলাতে পারে না কোনোভাবেই।

(সমাপ্ত)


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *